কালো টাকা ও অর্থ পাচারের সুযোগ বন্ধ করা উচিত
ঘাটতি, অস্বচ্ছতা ও গোঁজামিল দিয়ে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর জন্য প্রণীত জাতীয় বাজেটে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আকাঙ্ক্ষার কোনো প্রতিফলন দেখা যায় না বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, বাজেট প্রণয়নে কালো টাকা সাদা করা ও অর্থ পাচারের সুযোগ বন্ধ করে সৎ কর্মকাণ্ডকে উৎসাহিত করা উচিত। বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির ‘বিকল্প বাজেট প্রস্তাবনা ২০২২-২৩ প্রস্তুতি আলোচনা: সিলেট অঞ্চলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময়’ শীর্ষক সভা থেকে এমন মন্তব্য করেন তারা। ভার্চুয়াল মাধ্যমে গতকাল এ সভার আয়োজন করা হয়।
বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. আবুল বারকাতের সভাপতিত্বে আলোচনায় সিলেট বিভাগের চারটি জেলার নানা শ্রেণী-পেশার প্রতিনিধিরা এতে অংশ নেন। আলোচনা সভায় আঞ্চলিক সমস্যা ও সম্ভাবনার আলোকে বিকল্প বাজেটে অন্তর্ভুক্তিতে তাদের প্রত্যাশ্যার কথা তুলে ধরেন।
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত বলেন, রাষ্ট্র, সরকার ও রাজনীতি এখন রেন্ট-সিকার গোষ্ঠীর দাসে পরিণত হয়েছে। ১৭ কোটি মানুষের বাংলাদেশে আবারো বৈষম্যমূলক দ্বৈত-অর্থনীতি পাকাপোক্ত রূপ নিয়েছে। তিনি বলেন, সরকারি পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে জাতীয় নীতি ও বাজেট প্রণয়নকারীদের চিন্তা ও স্বদেশপ্রেমের দীনতা। টানা ২৮ বছরসহ ৪৮টি জাতীয় বাজেটের মধ্যে ৩০টি উপস্থাপনকারী সিলেটে অঞ্চলের তিনজন অর্থমন্ত্রী। প্রাকৃতিক সম্পদ ও বৈদেশিক মুদ্রার প্রাচুর্য থাকলেও কৃষি খাতের মাধ্যমে এ বিভাগের গ্রামীণ পরিবারের বার্ষিক আয় দেশের মধ্যে সবচেয়ে কম, ৬৩ হাজার ৪২১ টাকা। অথচ কৃষিযোগ্য জমির ৫৫ শতাংশই অনাবাদি পড়ে থাকে। এখানে ৪৯ শতাংশ মানুষ নিরক্ষর। স্বাস্থ্যকেন্দ্রে শিশু প্রসবের হার মাত্র ৩৮ শতাংশ। জন্মের সময় শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হারও দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি।
অর্থনীতি সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. মো. আইনুল ইসলাম বলেন, অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় সিলেট বিভাগের মানুষের যতটুকুই উন্নয়ন হয়েছে, তা সম্পূর্ণই প্রবাসীদের পাঠানো অর্থে। বিনিয়োগবান্ধব কর্মকৌশল, আমলতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস, স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত ব্যবস্থাপনা ও সুষম আঞ্চলিক উন্নয়নকে গুরুত্ব দেয়া হলে বিভিন্ন সূচকে পিছিয়ে থাকা অঞ্চলগুলোর আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন অনেক আগেই বাস্তব রূপ পেত।
বিনিয়োগের জন্য ওয়ান স্টপ পরিষেবার মাধ্যমে শুধু প্রবাসী ও রফতানিতে অর্জিত অর্থ অবকাঠামোগত উন্নয়ন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা খাতে প্রবাহিত করা গেলে এ অঞ্চলের চেহারাই বদলে যেত বলে সভায় মতামত তুলে ধরেন সিলেট অঞ্চলের বক্তারা।
তারা বলেন, দেশের ১৬৭টি চা-বাগানের মধ্যে ১৩৬টিই সিলেট বিভাগে। এ শিল্পে জড়িত শ্রমিকদের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন ও চা প্রক্রিয়া-বাজারজাতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে বাজেটে বিশেষ দিকনির্দেশনা থাকতে হবে। দেশের ৩৭৩টি হাওরের মধ্যে ২১৭টিই এ অঞ্চলে। এজন্য হাওরে কৃষি সম্পদ-মৎস্য-পশুসম্পদের উন্নয়ন এবং মৎস্য প্রজনন দুই মাস মাছ ধরা বন্ধ রেখে জেলেদের প্রণোদনা দেয়া জরুরি। এছাড়া প্রচুর সম্ভাবনাময় পর্যটন খাত সম্প্রসারণে পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পরিবেশবান্ধব যান চলাচল উৎসাহিতকরণ, পরিবেশ বিপর্যয় ও পাহাড় ধস কমাতে অপরিকল্পিতভাবে খনি থেকে পাথর উত্তোলন ও যত্রতত্র আবাসন বন্ধ করা প্রয়োজন।
মতবিনিময় সভায় বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির কার্যনির্বাহী কমিটির নেতারাসহ অধ্যাপক ড. সৈয়দ আশরাফুর রহমান, অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জহিরুল হক, ড. মো. মাহবুবুল হাকিম, ড. মুহাম্মদ আবু তাহের, অধ্যক্ষ জালাল উদ্দিন শাওন ও আলী আসগর প্রমুখ অংশ নেন।



