রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ঝুঁকিতে বৈশ্বিক পণ্য সরবরাহ
সাবেক সোভিয়েতভুক্ত দেশ ইউক্রেনের স্থল, আকাশ ও সমুদ্রসীমায় রাশিয়ার সামরিক আগ্রাসনের ফলে হুমকিতে পড়েছে বিভিন্ন পণ্যের সরবরাহ চেইন। বিশেষ করে শস্য ও তেলবীজের সরবরাহ চেইন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি। বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে এসব পণ্যের উল্লেখযোগ্য অংশের জোগান দিয়ে থাকে দেশ দুটি। পাশাপাশি রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা বিশ্বের নিষেধাজ্ঞার ফলে জ্বালানি ও ধাতব পণ্য রফতানিতেও প্রতিবন্ধকতা তৈরি হতে পারে। খবর রয়টার্স ও সিএনবিসি।
বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনের মোট ২৯ শতাংশ গমের সরবরাহ আসে রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে। যার বেশির ভাগই রফতানি করা হয় কৃষ্ণ সাগরের বন্দর ব্যবহার করে। আর এসব গমের উল্লেখযোগ্য ক্রেতা তুরস্ক, মিসরসহ মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার দেশগুলো। পাশাপাশি বিশ্বের শীর্ষ ভুট্টা রফতারিকারকের তালিকায় চতুর্থ অবস্থানে ইউক্রেন। দেশটি প্রতি মাসে ৪৫ লাখ টন ভুট্টা রফতানি করে, যার বেশির ভাগের ক্রেতা ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও চীন। অন্যদিকে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে সরবরাহকৃত সানফ্লাওয়ার তেলের ৮০ শতাংশের জোগান দেয় রাশিয়া ও ইউক্রেন। বিশ্লেষকরা জানান, ইউক্রেনকে সাধারণত ইউরোপের রুটির ঝুড়ি হিসেবে গণ্য করা হয়। আগ্রাসনের প্রভাবে এরই মধ্যে গম ও ভুট্টার দাম বাড়াতে শুরু করেছে। চলতি বছরের শুরুর তুলনায় শিকাগোয় গমের ভবিষ্যৎ সরবরাহ মূল্য বেড়েছে ১২ শতাংশের মতো। একই সময়ে ভুট্টার ভবিষ্যৎ সরবরাহ মূল্য বেড়েছে ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ। বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে খাদ্যপণ্যের দাম আরো বাড়তে শুরু করবে।
সোর্সিং টেকনোলজি কোম্পানির সিইও অ্যালেন হল্যান্ড বলেন, যুদ্ধের ফলে খাদ্য সরবরাহ চেইন সবচেয়ে বড় হুমকির সম্মুখীন হবে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কার্নির জ্যেষ্ঠ অংশীদার পার হং বলেন, রাশিয়ার দ্বারা ইউক্রেনের কৃষিক্ষেত্রগুলো দখল হয়ে গেলে খাদ্যের দাম অতিরিক্ত বাড়তে শুরু করবে।
বৈশ্বিক উৎপাদনের মোট ১৩ শতাংশ সার উৎপাদন করে রাশিয়া। এর মধ্যে পটাশ, ফসফেট ও নাইট্রোজেন উল্লেখযোগ্য। রাশিয়ার উৎপাদিত সারের উল্লেখযোগ্য রফতানি গন্তব্য এশিয়া ও ব্রাজিল। রাশিয়ার দ্বারা গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হলে বৈশ্বিক সার উৎপাদনেও এর প্রভাব পড়বে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা, যা খাদ্যশস্যসহ অন্যান্য খাদ্যপণ্যের দাম আরো বাড়িয়ে তুলবে।
ইউরোপে ব্যবহূত প্রাকৃতিক গ্যাসের জোগানের ৪০ শতাংশের জন্য রাশিয়ার ওপর নির্ভর করে অঞ্চলটি। গত বছর নাগাদও স্লোভাকিয়ায় গ্যাস রফতানির জন্য বৃহৎ ট্রানজিট করিডোর হিসেবে ব্যবহূত হয়ে আসছিল ইউক্রেন, সেখান থেকে অস্ট্রিয়া ও ইতালিতে গ্যাস রফতানি করা হতো। সম্প্রতি ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসনের পর নর্ড স্ট্রিম-২ পাইপলাইন স্থগিত করেছে জার্মানি। যদিও রাশিয়া বলছে বিশ্ববাজারে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত রাখা হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার গ্যাস রফতানির ওপর ইউরোপীয় ইউনিয়ন অথবা যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা অনেকটা অনিশ্চিত। রাশিয়ার গ্যাসের ওপর থেকে সম্পূর্ণ নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনা ইউরোপের জন্য স্বল্পমেয়াদে অনেকটাই অসম্ভব।
বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্র উৎপাদনে ধাতব কাঁচামাল সরবরাহের জন্যও ইউক্রেন ও রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল হয়ে আছে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন। রাশিয়ার আগ্রাসনের পর দুই দেশের মুদ্রার দাম অবনতির দিকে যাচ্ছে, যা রফতানি মূল্যকে আরো বাড়িয়ে তুলবে।
২০১৪ সালে রাশিয়া কর্তৃক ক্রাইমিয়া দখল করার পর মস্কোর ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা থেকে অব্যাহতি পেয়েছিল অধিকাংশ রুশ ধাতু উৎপাদনকারী। তবে এ সময় বিশ্বের অন্যতম অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদনকারী রুশ প্রতিষ্ঠান রুসালের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছিল। কোম্পানিটি ২০২১ সালে ৩৮ লাখ টন অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদন করেছিল, যা বৈশ্বিক উৎপাদন পরিমাণের প্রায় ৬ শতাংশ। ইউরোপ, এশিয়া ও উত্তর আমেরিকা মূলত রুসালের মূল বাজার হিসেবে গণ্য হয়ে থাকে।
ইউএস ভূতাত্ত্বিক জরিপ অনুসারে গত বছর ৯ লাখ ২০ হাজার টন পরিশোধিত তামা উৎপাদন করেছিল রাশিয়া, যা বৈশ্বিক উৎপাদনের ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। এর মধ্যে নরনিকেলের উৎপাদিত তামার পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ৬ হাজার ৮৪১ টন। রুশ তামার উল্লেখযোগ্য রফতানি গন্তব্য এশিয়া ও ইউরোপ।
নিকেল উৎপাদনেও শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে রাশিয়া। রুশ কোম্পানি নরনিকেল বিশ্বে পরিশোধিত নিকেল উৎপাদনের জন্য শীর্ষে অবস্থান করছে। গত বছর কোম্পানিটি ১ লাখ ৯৩ হাজার ৬ টন পরিশোধিত নিকেল উৎপাদন করে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশ ও অঞ্চলে ধাতু সরবরাহের জন্যও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে আবদ্ধ কোম্পানিটি।
পার হং বলেন, মার্কিন চিপ শিল্প অনেকাংশেই ইউক্রেনীয় নিকেলের ওপর নির্ভর করে। এছাড়া সেমিকন্ডাক্টর, জেট ইঞ্জিন, অটোমোবাইল এবং ওষুধ তৈরির জন্য গুরুত্বপূর্ণ কিছু উপাদান রাশিয়া থেকেও আমদানি করে দেশটি।
একই সঙ্গে প্লাটিনাম উৎপাদনেও কোম্পানির অবস্থান উল্লেখযোগ্য। গত বছর ২৬ লাখ ট্রয় আউন্স প্যালাডিয়াম উৎপাদন করে নরনিকেল, যা বৈশ্বিক উৎপাদনের ৪০ শতাংশ।



