৩০ জুন পর্যন্ত ঋণের কিস্তি স্থগিতের দাবি ব্যবসায়ী নেতাদের
ব্যাংক ঋণের কিস্তি পরিশোধে আবারো ছাড় চেয়েছেন দেশের ব্যবসায়ী নেতারা। চলতি বছরের ডিসেম্বরের কিস্তি ২০২৩ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত স্থগিত রাখার দাবি জানিয়েছেন তারা।
আজ সোমবার (১২ ডিসেম্বর)বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ব্যবসায়ী নেতারা এ দাবি জানান। ঋণ পরিশোধে নীতি ছাড় ছাড়াও আমদানি এলসির মার্জিন কমানো, ইডিএফ ঋণের মেয়াদ বাড়ানো, আমদানির এলসির জন্য রিজার্ভ থেকে ডলার সহায়তা দেয়া, আমদানি ও রফতানি উভয় ক্ষেত্রে ডলারের মূল্য সমান রাখাসহ বেশকিছু দাবি জানিয়েছেন তারা। গভর্নরের পক্ষ থেকেও ব্যবসায়ী নেতাদের দাবি ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখার আশ্বাস দেয়া হয়েছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র নিশ্চিত করেছেন।
ব্যবসায়ী নেতাদের নেতৃত্ব দেন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ড্রাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন। বৈঠকে গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার ছাড়াও বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নররা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠক শেষে এফবিসিসিআই সভাপতি জসিম উদ্দিন বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক রমজান মাসকে কেন্দ্র করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির এলসি মার্জিনে ছাড় দিয়েছে। বিষয়টিকে আমরা ইতিবাচক হিসাবেই দেখছি। তবে আমরা বাংলাদেশ ব্যাংককে বলেছি, দেশে এমন কিছু ব্যবসা আছে যেগুলোর অর্ধেকই রমজান মাসে হয়। এজন্য আমরা রোজাকে সামনে রেখে এলসি খোলার বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখতে অনুরোধ করেছি। প্রয়োজনে রিজার্ভ থেকে ডলার সহায়তা দিয়ে হলেও এলসি খোলায় বিষয়টি স্থিতিশীল করতে বলেছি।
গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটের কারণে দেশের শিল্প কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে উল্লেখ করে এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, ‘দেশে এখনো গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট কাটেনি। শিল্প উৎপাদন ব্যহত হওয়ায় রফতানি খাতও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে কারখানায় কর্মরত শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ করাই কঠিন হচ্ছে। এ অবস্থায় ডিসেম্বর মাসের ঋণের কিস্তি ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত বর্ধিত করার অনুরোধ করেছি। ৩০ জুন পর্যন্ত যেন ব্যবসায়িদের ঋণ খেলাপি না করার হয় সে দাবি জানিয়েছি।’
জসিম উদ্দিন বলেন, ‘আমদানি ও রফতানির ক্ষেত্রে দেশে ডলারের দুই ধরনের দর নির্ধারিত আছে। রফতানিকারকরা প্রতি ডলারের বিপরীতে ১০১ টাকা পাচ্ছেন। আমদানির ক্ষেত্রে ডলারের দাম রাখা হচ্ছে ১০৫ টাকার বেশি। ব্যকওয়ার্ড লিংকেজের ক্ষেত্রে আমদানিকারকরা ডলার প্রতি ১০৫-১০৭ টাকায় পণ্য আমদানি করছে। যদিও উৎপাদিত পণ্য রফতানি করে পাচ্ছে ১০১ টাকা। এ অবস্থায় আমরা বলেছি, আমদানি-রফতানি উভয় ক্ষেত্রে যেন ডলারের একই দর রাখা হয়। রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে ডলারের দর বর্ধিত থাকুক, সেটি নিয়ে আমাদের কোনো আপত্তি নেই।’
ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে রফতানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) থেকে নেয়া ঋণের মেয়াদও বাড়ানোর দাবি জানানো হয়েছে বলে জসিম উদ্দিন জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ইডিএফের ঋণের মেয়াদ বাড়িয়ে ২৭০ দিন করার জন্য প্রস্তাব দিয়েছি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক আমাদের দাবিগুলোর বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে।’
উল্লেখ্য, ঋণ পরিশোধের জন্য ব্যবসায়ীদের এর আগেও কয়েক দফায় ছাড় দেয়া হয়েছে। ২০২০ সালের শুরু থেকে এ ছাড় চলছে। তারপরও খেলাপি না করার দাবি জানানো হচ্ছে কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, ‘বাংলাদেশের আজকের পরিস্থিতি কভিডের চেয়েও খারাপ। প্রত্যেকটি কাঁচামালের দাম বেড়েছে। জ্বালানি তেলে দাম বাড়ার নেতিবাচক প্রভাব সব খাতে পড়েছে। ডলার সংকটের কারণে সরকার জ্বালানি তেল আমদানি করতে পারছে না। গ্যাসের প্রেশার না থাকার কারণে আমরা কারখানা চালাতে পারছি না। আমি যদি কারখানা চালাতে না পারি, এলসি করে যদি কাঁচামাল আমদানি করতে না পরি, তাহলে ব্যাংকের ঋণের কিস্তি কিভাবে পরিশোধ করবো? আমি কিস্তি দিতে না পারলে খেলাপি হবো। এর ফলে ব্যাংকও খেলাপি হয়ে যাবে। কভিডের সময় ঋণ পরিশোধে ছাড় দেয়া হয়েছিলো। এখন কি আমরা কভিডের চেয়ে ভালো অবস্থানে আছি নাকি?’
অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ ভালো অবস্থানে নেই উল্লেখ করে জসিম উদ্দিন বলেন, ‘ব্যাংক ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে নীতি সহায়তা দরকার। আমরা ব্যাংকে ঋণের সুদ পরিশোধ করবো। এক্ষেত্রে ব্যাংক সুদ পাবে, আমরাও খেলাপি হবো না। এটি করলে ব্যাংকেরও ক্ষতি হবে না, আবার ব্যবসায়ীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। যে ঋণ পরিশোধ করতে পারছে, তার জন্য তো এ সুবিধা দরকার নেই। যে পরিশোধ করতে পারছে না, আমরা তার বিষয়ে সুবিধা চাচ্ছি।’
ঋণের সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদের ক্যাপ না তোলার জন্যও ব্যবসায়ী নেতাদের পক্ষ থেকে গভর্নরকে অনুরোধ জানানো হয়। বিষয়টি উল্লেখ করে এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, ‘সুদহার কম থাকলে বিনিয়োগ বেশি হয়। আমাদের দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি মেলালে হবে না। যুক্তরাষ্ট্রে ঋণের সুদহার বাড়ালে মূল্যস্ফীতি কমবে। কিন্তু এ নীতি আমাদের দেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হওয়ার কথা নয়। কারণ আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ ব্যাংকের বাইরে আছে। আমরা আমদানি নির্ভর একটি দেশ। ঋণের সুদহার বাড়ালে পণ্যের দাম আরো বেড়ে যাবে।’
গত ১১ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে রমজান উপলক্ষ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করতে আমদানি এলসি মার্জিন শিথিল করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এক্ষেত্রে পণ্য হিসাবে ভোজ্যতেল, ছোলা, ডাল, মটর, পেঁয়াজ, মসলা, চিনি এবং খেজুর আমদানির কথা উল্লেখ করা হয়েছিলো। এ তালিকায় নতুন করে আরো কিছু পণ্যের নাম যুক্ত করার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ইতিবাচক সায় দেয়া হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের দাবির বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. মেজবাউল হক বলেন, ‘কভিডের সময় দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বিভিন্ন ধরনের নীতি সহায়তা দেয়া হয়েছিলো। এখন কভিড না থাকলেও বাংলাদেশসহ বিশ্ব অর্থনীতিতে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি চলছে। এ পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে যেসব দাবি জানানো হয়েছে, সেগুলোকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতিবাচক হিসাবে দেখছে। আশা করছি, ব্যবসায়ীদের যৌক্তিক দাবির বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অতীতের মতো প্রদক্ষেপ গ্রহণ করবে।’


