যুক্তরাজ্য-ভারতের এফটিএ উদ্যোগে দুশ্চিন্তায় বাংলাদেশ

স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) হিসেবে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধার (জিএসপি) আওতায় যুক্তরাজ্যে পণ্য রফতানিতে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পেয়ে আসছে বাংলাদেশ। অন্যদিকে ভারতীয় রফতানিকারকদের শুল্ক দিতে হয় ৯ থেকে সাড়ে ৯ শতাংশ। তবে শিগগিরই যুক্তরাজ্য ও ভারতের মধ্যে একটি মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এটি বাস্তবায়ন হলে ভারতের পণ্যও যুক্তরাজ্যের বাজারে শুল্কমুক্তভাবে প্রবেশ করতে পারবে। বিষয়টি দুশ্চিন্তায় ফেলেছে বাংলাদেশের বাণিজ্য সংশ্লিষ্টদের।

দেশে তৈরি পোশাক পণ্যের তৃতীয় বৃহত্তম রফতানি গন্তব্য হলো যুক্তরাজ্য। দেশটিতে ভারত শুল্কমুক্ত পণ্য প্রবেশাধিকার পেলে তা বাংলাদেশের রফতানি ও বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এ অবস্থায় সম্ভাব্য করণীয় পদক্ষেপগুলো খতিয়ে দেখতে শুরু করেছেন নীতিনির্ধারকরা। বিষয়টি নিয়ে পরামর্শ চেয়ে গতকাল বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনকে চিঠি দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গিয়েছে, লন্ডনে নিযুক্ত বাংলাদেশী দূতাবাস সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে, শিগগিরই যুক্তরাজ্য ও ভারতের মধ্যে এফটিএ সই হতে যাচ্ছে।

ব্রিটিশ একটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের উদ্ধৃতি দিয়ে দূতাবাস জানায়, এফটিএ স্বাক্ষরিত বা চুক্তি স্বাক্ষরের আগে আর্লি হার্ভেস্ট ট্রেড ডিল সম্পাদিত হলে ব্রিটিশ তৈরি পোশাক খাতের উৎপাদনকারী, সরবরাহকারী ও খুচরা বিক্রেতারা ভারতমুখী হবে। বিষয়টি বাংলাদেশের রফতানি ও বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই এ বিষয়ে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, ভারত ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে এফটিএ হলে বাংলাদেশ কী কী সুবিধা হারাবে বা কোন কোন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হতে পারে; সে বিষয়ে সুচিন্তিত পর্যালোচনা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের রফতানি ও বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাবের আশঙ্কা কাটাতে সম্ভাব্য করণীয় পদক্ষেপ নিয়ে ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনকে সুচিন্তিত পরামর্শসহ প্রতিবেদন পাঠাতে বলা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যান মো. আফজাল হোসেন বলেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এ ধরনের একটি চিঠি তারা পেয়েছেন। এছাড়া এলডিসির তালিকা থেকে বের হয়ে উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার জন্য দ্বিতীয় দফায় জাতিসংঘের সুপারিশ পেয়েছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে প্রস্তুতিকাল হিসেবে পাঁচ বছর সময় পেয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২৬ সালে বাংলাদেশের উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ কার্যকর হবে। তখন এসব দেশের পণ্য রফতানিতে আর শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া যাবে না। তাই আমাদেরও বিভিন্ন দেশের সঙ্গে এফটিএ বা অগ্রাধিকার বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) করতে হবে।

তিনি আরো বলেন, এসব চুক্তি করার ক্ষেত্রে অনেক দেশই আমাদের বিবেচনায় ছিল। তবে এ পর্যন্ত মাত্র একটি দেশ ভুটানের সঙ্গে পিটিএ করা হয়েছে। এছাড়া শ্রীলংকার সঙ্গে চুক্তির কার্যক্রম চলছে। সেটা শিগগিরই হয়ে যাবে। এছাড়া বিভিন্ন দেশের সঙ্গে এ ধরনের চুক্তি নিয়ে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। ভারত ও যুক্তরাজ্য এফটিএ করে ফেললে তখনই কিছু চ্যালেঞ্জ আসবে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। এক্ষেত্রে করণীয় পদক্ষেপগুলো আমরা পর্যালোচনা করে দেখছি।

এদিকে তৈরি পোশাক খাতে ব্যবসায়ীরা বলছেন, যুক্তরাজ্যের বাজারে ভারতে পণ্যকে শুল্ক দিয়ে প্রবেশ করতে হলেও বাংলাদেশে ব্যবসায়ীদের তাদের সঙ্গে অনেক প্রতিযোগিতায় পড়তে হয়। কারণ বিভিন্ন কারণে বাংলাদেশে পণ্য উৎপাদন খরচ বেশি। এছাড়া ভারত সরকার সে দেশের উদ্যোক্তাদের নানা ধরনের সুবিধা দেয়, যা বাংলাদেশে দেয়া হয় না। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতেই তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকাটা কঠিন। এরপর যদি তারা এফটিএ করে ফেলে, তাহলে এ প্রতিযোগিতা আরো বেড়ে যাবে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি ফারুক হাসান বলেন, ভারত ও যুক্তরাজ্য যদি এফটিএ করে, তাহলে আমরা যে সুবিধাটা পেতাম; সেটা পাব না। কারণ তখন তাদেরও কোনো শুল্ক দেয়া লাগবে না। এজন্য আমাদেরই সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এর অংশ হিসেবে আমদানি-রফতানির ক্ষেত্রে যতগুলো প্রক্রিয়া রয়েছে, সেগুলো সহজ করতে হবে। কারণ এসব ক্ষেত্রে অন্যান্য দেশের তুলনায় আমাদের বেশি খরচ হয়। আমদানি-রফতানির প্রক্রিয়াগুলো সহজ করতে পারলে খরচ কমবে; সময়ও কমবে।

তিনি আরো বলেন, ভারতসহ আমাদের প্রতিযোগী দেশগুলো রফতানিকে চাঙ্গা রাখতে তাদের মুদ্রার অনেকটা অবমূল্যায়ন করেছে। আমাদের মুদ্রাকেও রফতানি উপযোগী করতে হবে। তাহলে রেমিট্যান্সও বাড়বে। এছাড়া আমরা পণ্যে বৈচিত্র্য আনার উদ্যোগ নিয়েছি, সেগুলোয় সরকারের সহযোগিতা লাগবে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে বেরিয়ে আসার (ব্রেক্সিট) সিদ্ধান্ত নেয়ার পর পরই যুক্তরাজ্যের মুদ্রা পাউন্ডের অবমূল্যায়ন শুরু হয়। ফলে দেশটিতে একসময় পণ্য রফতানি বাবদ অর্জিত আয় কমে যায় বাংলাদেশের। তবে পরবর্তী সময়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে পাউন্ড। মুদ্রাবাজারে ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে উঠছে পাউন্ডের বিনিময় হার, যার প্রভাবে যুক্তরাজ্য থেকে বাংলাদেশের রফতানি আয়েও দেখা দিয়েছে ব্যাপক উল্লম্ফন। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশটিতে বাংলাদেশ ৩৮৫ কোটি ৯১ লাখ ডলারের পোশাক রফতানি করেছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে রফতানি হয়েছে ৩১৭ কোটি ৩২ লাখ ডলারের পণ্য। ২০২০-২১ অর্থবছরে রফতানি হয়েছে ৩৪৪ কোটি ৪৫ লাখ ডলারের পোশাক।

 

সম্পর্কিত খবর