একান্ত সাক্ষাৎকারে তালুকদার মো. জাকারিয়া হোসাইন
মাত্র ১ ঘন্টায় দাবি পরিশোধ, বীমা খাতে ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্সের রেকর্ড!

 

আদম মালেক : বীমা করার পর অনেক কোম্পানী যথা সময়ে বীমা দাবি পরিশোধ করে না। বহু গ্রাহক শূন্য হাতে ফিরে যায়, কিছুই পায় না। এমন নানা অভিযোগে অভিযুক্ত অনেক কোম্পানী। কিন্তু এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম নন লাইফ বীমা কোম্পানী ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড। মাত্র ১ ঘন্টার ব্যবধানে কোম্পানীটি বীমা দাবি পরিশোধের দৃষ্টান্ত রেখেছে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির মূখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা তালুকদার মোহাম্মদ জাকারিয়া হোসাইন।

বাংলাদেশে বীমা জগতের রোল মডেল ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্স- গর্বের সঙ্গে এমন দাবী করে বলেন, আমরা নিয়মিত বীমা দাবি পরিশোধ করি। কোনো দাবীই বকেয়া নেই। ২/১ টি দাবী বকেয়া থাকতে পারে, এটা স্বাভাবিক। তারা হয়তো আমাদের শর্ত পূরণ করতে পারেনি বা কাগজপত্র ত্রুটিপূর্ণ ছিল অথবা সার্ভে রিপোর্ট আসতে দেরী হয়েছে।  এমন ব্যতিক্রম বিষয় ছাড়া, মাত্র ১ ঘন্টায় বীমা দাবী পরিশোধ করেছে ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্স। এই উদাহরণ শুধু ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি নয়, এটা ইন্সুরেন্স ইন্ডাস্ট্রির রেকর্ড। ক্লেইম এসেছে, এক ঘন্টায় আমি ক্লেইম পরিশোধ করেছি। এটাই আমাদের সার্ভিস। এর আগে ২০২০ সালে আমাদের কাছে ইকো কটন মিল্স লিমিটেডের ১ কোটি ৬০ লাখ টাকার একটা অগ্নি বীমার দাবী ছিল। এই দাবী আমি বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে পরিশোধ করবো বলে ব্যবস্থা নিয়েছি এবং দিয়েছিও। দেওয়ার সময় বলেছিলাম আমার কোম্পানীতে ১১ টার সময় বীমা দাবী এসেছে। মাত্র ২ ঘন্টার ব্যবধানে ১ টার সময় দাবী পরিশোধ করেছি। তখন আইডিআর এর এক পরিচালক বলেছিলেন এটা কি সম্ভব। তখন আমি বলেছিলাম, ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্সে এটা সম্ভব। মার্কেটে বীমা দাবী পরিশোধের ক্ষেত্রে ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী এখন শীর্ষে। আমাদের কোনো দাবী বকেয়া নেই।
স্মৃতি চারণ করে এই বীমাবীদ বলেন, আমাদের ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্স কোম্পানীর বিরুদ্ধে একজন আইডআর এর কাছে নালিশ করে। তখন আইডিআরএর ঐ কর্মকর্তা অভিযোগকারীকে আইডিআরের কাছে ঘোরাঘুরি না করে ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্সের এমডি-চেয়ারম্যানের শরণাপন্ন হওয়ার উপদেশ দেন। ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্স কখনো পরিশোধযোগ্য দাবী বাকি রাখে না ।
নানা প্রতিকূলতার মধ্যে এগিয়ে চলছে এগিয়ে চলছে বীমাখাত। বীমা খাত উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রীও মনযোগী। পাশাপাশি বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন, ইন্স্যুরেন্স ফোরাম, আইডিআরএ তৎপর। এখন রাষ্ট্রীয়ভাবে বীমা দিবস পালিত হচ্ছে, বিভাগীয় পর্যায় মেলা হচ্ছে। এসব কাজের সুফল বীমা খাত ধীরে ধীরে পাচ্ছে। সবার চেষ্টার মধ্যদিয়ে আগামীতে আরো বড় পরিবর্তন আসবে।
দেশে অনেকগুলো বীমা কোম্পানী ব্যবসা পরিচালনা করছে। তাদের সেবার মান ও প্রতিযোগিতা নিয়ে তালুকদার মো. জাকারিয়ার বক্তব্য হচ্ছে, এখন মার্কটে ৪৬টি কোম্পানি। প্রতিযোগিতা সর্বত্র বিদ্যমান। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে ভালো কিছু করতে হবে। গ্রাহক সেবার মান বাড়াতে হবে। যে যত ভালো সেবা দিতে পারবে সে তত ভালো ব্যবসা করতে পারবে।
বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্সের এই মূখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, বিভিন্ন কোম্পানীর বিরুদ্ধে অতিরিক্ত কমিশনে ব্যবসার অভিযোগ রয়েছে। তবে কমিশন সরকারীভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আমাদের ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী এখন একটি ব্র্যান্ড। এ প্রতিষ্ঠানটির একটি বড় পরিচিতি তৈরী হয়েছে। যে কারণে কমিশনের প্রয়োজন হয় না। বরং কমিশনের পরিবর্ত সেবাটাই মুখ্য হয়ে উঠেছে।

কোভিডের প্রভাব সম্পর্কে অনেকের মতো তাঁরও রয়েছে তিক্ত অভিজ্ঞতা। বলেছেন, কোভিডে এক বছর আমরা ব্যবসা করতে পারিনি। সারা পৃথিবী অচলাবস্থায় ছিল। পৃথিবীতে লকডাউন ছিল। তবে, সারা বাংলাদেশে অর্থর্নীতির এখন চাঙ্গাভাব। এখন আমরা স্থবিরতা কাটিয়ে ধীরে ধীরে ব্যবসার দিকে ফিরছি। অর্থনীতি চাঙ্গা থাকলে ইন্স্যুরেন্স সচল থাকে। কোভিড আমাদের অনেক শিক্ষা দিয়েছে। যেমন আইডিআর আমাদের নির্দশনা দিয়েছে আমরা যেনো অনলাইনে আসি। বেশীরভাগ কোম্পানী এই কোভিডের ভেতর অনলাইনে এসে গেছে। অনলাইন গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে এ কারণে যে বাংলাদেশ এখন ডিজিটাল হয়েছে। যে কারণে কোভিডে আমরা ডিজিটালাইজেশনের সুবিধা ভোগ করতে পেরেছি। ব্যবসায় ক্ষতি হয়েছে কিন্তু প্রশাসনিক বা অফিসিয়াল লেনদেন অনলাইনে করতে পেরেছি। আমরা কোভিড সংকট মোকাবেলা করে যথাযথ গ্রাহক সেবা বজায় রাখার চেষ্টা করেছি।

তবে বীমা বিকাশের অন্তরায় সম্পর্ক তাঁর পর্যবেক্ষণ যেমন তীক্ষ্ণ তেমন এ খাতের উন্নয়নে তাঁর পরামর্শও প্রশংসার দাবিদার। বলেছেন, আজ বীমা পণ্যের বড় অভাব। যুগোপযোগী বীমা পণ্য নেই। তাই বিমা খাতে খরা। থার্ড পার্ট ইন্স্যুরেন্স বাতিল হয়েছে। থার্ড র্পাটি বাতিলে বীমা খাতে আরও ভাটা পড়েছে। এখন অন্য কোনো উপায়ে তা মার্কেটে আনতে হবে। থার্ড পার্ট নেই তাহলে ফার্স্ট পার্ট চালু করতে হবে। রাস্তায় গাড়িগুলোর কোনো ইন্স্যুরেন্স নেই। বিশ্বের কোথাও ইন্স্যুরেন্স ছাড়া গাড়ী চলার নজির নেই। মটরযানকে আবার ইন্স্যুরেন্স এর আওতায় আনতে হবে। প্রতিটি ফ্ল্যাট ও বাড়িকে ইন্স্যুরেন্সের আওতায় আনতে হবে। অভ্যন্তরীণ ও আর্ন্তাতিক ভ্রমণকেও বীমার অন্তর্ভুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ। এখান থেকে প্রিমিয়াম আসবে। কৃষিখাতে আমাদের ইন্স্যুরেন্স নেই বললেই চলে। কৃষকের দোরগোড়ায আমরা যেতে চাই। কিন্তু কৃষককেতো সেই সুবিধা আমরা দিচ্ছি না। ঋণ দিচ্ছি কিন্তু ঋণের বিপরীতে শস্যের যে ঝুঁকি তাতো আমরা বহন করছি না। সারাদেশে ধান পাট চাষ হচ্ছে। কিন্তু এসবের জন্য কোনো বীমা হচ্ছে না। এসব ক্ষেত্রে ইন্স্যুরেন্স করলে তার সম্প্রসারণ বাড়বে। স্বাস্থ্য বীমা বাড়াতে হবে। ম্যারাডোনার একটি পা ৪ কোটি ডলারে ইন্স্যুরেন্স করা হয়েছে। কিন্তু আমাদেরতো এ ধরনের বীমার নজির নেই। স্বাস্থ্যে ব্যাপক বীমা সম্ভব। জয়েন্ট স্টক থেকে যখন একটি কোম্পানী গঠিত হয় তখন তার পরিশোধিত মূলধনের ওপর বীমা প্রিমিয়াম নির্ধারণ করা উচিত। সরকার যেমন প্রতিটি জায়গায় ভ্যাট প্রয়োগ করছে, তেমনি সর্বক্ষেত্রে ইন্স্যুরেন্সকে বাধ্যতামূলক করতে হবে। প্রিমিয়াম বাড়লে বীমাখাত সমৃদ্ধ হবে। এতে সরকারের এসডিজির লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে।

বীমায় দক্ষ জনশক্তির অভাব পূরণে করণীয় সম্পর্কে তিনি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বীমার ওপর একটি বিষয় চালু করা হয়েছে। এর বাইরেও উদ্যোগ রয়েছে। আমাদের অ্যাকচুয়ারির খুবই অভাব। সরকার একচুয়ারির জন্য বিদেশে প্রশিক্ষণে পাঠাবে। একইসাথে বীমায় দক্ষ জনশক্তি তৈরীতে বিভিন্ন মহল থেকে যে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, এতে করে একসময় দক্ষ জনবলের ঘাটতি থাকবে না। বিশেষ করে ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্স বীমা খাতে বিভিন্ন সভা, সেমিনার, প্রশিক্ষনের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি তৈরীতে কাজ করে যাচ্ছে।
এই বীমা ব্যক্তিত্ব দাবি করেছেন, রি-ইন্স্যুরেন্সের জন্য বাংলাদেশের সক্ষমতা আছে। বাংলাদেশে করপোরেট পুঁজির মালিকরা আছে। তারা যদি একটি রি-ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী গঠন করে তাহলে তা আমাদের জন্য সুবিধাজনক হবে। দেশের টাকা বিদেশে যাবে না। দেশেই থাকবে।

ইন্স্যুরেন্সের উন্নয়নে সরকারের কাছে তাঁর রয়েছে বেশ কিছু প্রত্যাশা । তিনি বলেছেন, ইন্স্যুরেন্সের প্রতি অবজ্ঞাটা বেশী করা হয়। নেতিবাচক বিষয়গুলো ফলাও করে প্রচার হয়। কিন্তু সুফলগুলো আলোচনায় তেমন আসে না। সরকারকে বীমার সুফল প্রচার প্রসারের জন্য আরো বেশী এগিয়ে আসতে হবে। একজন মানুষ যখন বীমা সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পোষণ কওে, তা সংশোধনের জন্য সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। আমাদেরও করণীয় আছে। যে বীমা দাবিগুলি পরিশোধ হয় তা সভা সেমিনারের মাধ্যমে সকল গণমাধ্যমে প্রচার করতে হবে।

সম্পর্কিত খবর