ভারতের পুঁজিবাজারে সবচেয়ে বড় ও ব্যর্থ আইপিও পেটিএম
ভারতের শীর্ষস্থানীয় ডিজিটাল পেমেন্ট সেবা প্রদানকারী পেটিএমের যাত্রা ২০১৬ সালে। এর পাঁচ বছরের মাথায় গত বছরের নভেম্বরে ভারতের পুঁজিবাজারের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় কোম্পানি হিসেবে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে তালিকাভুক্ত হয় পেটিএমের মূল কোম্পানি ওয়ান৯৭ কমিউনিকেশনস। তবে আইপিওতে আসার সময় যতটা সাড়া ফেলে দিয়েছিল কোম্পানিটি সেটিই পরবর্তী সময়ে সবচেয়ে ব্যর্থ আইপিওতে পরিণত হয়েছে। আইপিওতে আসার পর থেকে এখন পর্যন্ত কোম্পানিটির শেয়ারদর কমেছে ৫৯ শতাংশ।
২০২১ সালের ১৮ নভেম্বর ভারতের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় পেটিএম। সেই সময় কোম্পানিটি পুঁজিবাজার থেকে ১৮ হাজার ৩০০ কোটি রুপি সংগ্রহ করে। তালিকাভুক্তির দিনে কোম্পানিটির শেয়ার লেনদেন ২ হাজার ১৫০ রুপিতে শুরু হয়। সে হিসেবে কোম্পানিটির বাজার মূলধন ছিল ১ লাখ ৩৮ হাজার কোটি রুপি। প্রথম দিনেই কোম্পানিটির শেয়ার ৩০ শতাংশ দর হারায়। এর পর থেকেই ক্রমেই দরপতন হতে থাকে কোম্পানিটির। এ বছরের ১২ মে কোম্পানিটির শেয়ার সর্বনিম্ন ৫১৫ দশমিক ৯০ রুপিতে নেমে যায়। এরপর অবশ্য কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে কোম্পানিটির শেয়ার। সর্বশেষ গত শুক্রবার কোম্পানিটির শেয়ার ৬৫৬ দশমিক ৩ রুপিতে লেনদেন হয়েছে। এ সময় কোম্পানিটির বাজার মূলধন ছিল ৪১ হাজার ৪৮৩ কোটি রুপি।
ভারতের স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি পেটিএমে বিনিয়োগ রয়েছে সিঙ্গাপুর, কানাডা, আবুধাবিসহ একশর মতো বিদেশী প্রতিষ্ঠানের। জ্যাক মার অ্যান্ট গ্রুপ ও আলীবাবা গ্রুপ, জাপানের সফট ব্যাংক ও ওয়ারেন বাফেটের বার্কশায়ার হ্যাথওয়ের মতো প্রতিষ্ঠানও বিনিয়োগ করেছিল পেটিএমে। তবে কোম্পানিটির শেয়ারের বড় দরপতনে বিশাল লোকসানের মুখে রয়েছে এর বিনিয়োগকারীরা। অবশ্য সম্প্রতি জ্যাক মার আলিবাবা ও অ্যান্ট ফাইন্যান্সিয়াল পেটিএমের শেয়ার বিক্রি করে দিয়েছে। পেটিএমের সঙ্গে আলিবাবার পথচলা পাঁচ বছরের। সেই সময় পেটিএম মলের জন্য বড় অংকের অর্থ বিনিয়োগ করেছিল আলিবাবা, যা ছিল ভারতের ই-কমার্স বাজারে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ। মূলত ২০১৭ সালে আলিবাবার কাছ থেকে প্রথম ২০ কোটি ডলারের তহবিল সংগ্রহ করে পেটিএম। এছাড়া অ্যান্ট ফাইন্যান্সিয়াল, সফট ব্যাংক, এলিভেশন ক্যাপিটালের কাছ থেকে ৮০ কোটি ডলারের বেশি সংগ্রহ করে পেটিএম। ফলে যাত্রার শুরুতেই ১০০ কোটি ডলারের বড় অংকের মূলধন নিয়ে বাজারে নামে পেটিএম।
ব্যবসা বাড়ানো ও বাজার দখলে বড় অংকের পুঁজি বিনিয়োগ করা সত্ত্বেও ধারাবাহিক লোকসান হয়েছে পেটিএমের। পাশাপাশি ভারতের বাজারে গত কয়েক বছরে বেশ কয়েকটি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানও চলে আসে। তাছাড়া ভারতে ডিজিটাল মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তরের সিস্টেমের সেবা নিতে কোনো ফি দিতে হয় না। এতে ডিজিটাল ওয়ালেট ব্যবসার ওপর ব্যাপক প্রভাব পড়ে। গ্রাহককে ঋণ দেয়া, ক্রেডিট কার্ড, সম্পদ ব্যবস্থাপনা, বীমা, সিনেমার টিকেপ, ফ্যান্টাসি স্পোর্টস ও ই-কমার্সের মতো বিভিন্ন খাতে ব্যবসা বহুমুখী করার উদ্যোগ নিয়েছিল পেটিএম। কিন্তু তা কোম্পানি ব্যবসায় উল্লেখযোগ্য প্রভাব রাখতে পারেনি। বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন, পেটিএমের ঘুরে দাঁড়ানোর একটি পথ ছিল ব্যাংক হিসেবে যাত্রা শুরু করা। কিন্তু চীনের আলিবাবার মতো প্রতিষ্ঠানে পেটিএমে বড় অংশীদারত্ব থাকায় ভারতের নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছ থেকে ব্যাংকের লাইসেন্স পাওয়া দুষ্কর ছিল।
আইপিওর আগে পেটিএমের ভ্যালুয়েশন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এক্ষেত্রে বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রতি রাউন্ডের তহবিল সংগ্রহের পর অনুমান, ধারণা, প্রক্ষেপণসহ বিভিন্ন বিষয়কে ভিত্তি করে ভ্যালুয়েশন করা হয়। তাই এটি সংখ্যা ছাড়া আর কিছু নয়। কোম্পানির ব্যবসার খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ করেই বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ করা উচিত।
পেটিএম যে সময়ে আইপিওতে এসেছে সেটি নিয়েও কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন। বছরের শেষের দিকে হওয়ার কারণে এরই মধ্যে অনেক আইপিও চলে এসেছিল। ফলে সেই সময় বাজারে পর্যাপ্ত তারল্যের অভাব ছিল। বছরের শেষ দিকে এত বেশি শেয়ার বিনিয়োগকারীদের সেভাবে আকৃষ্ট করতে পারেনি। পেটিএমের চার মাস আগে আইপিওতে আসা জোমাটোর ক্ষেত্রে ৩৮ গুণ ও নাইকার ক্ষেত্রে ৮২ গুণ বেশি আবেদন পড়েছিল। অথচ পেটিএমের ক্ষেত্রে আবেদন পড়েছিল মাত্র ১ দশমিক ৯ গুণ।
রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া এ বছরের মার্চে পেটিএম পেমেন্ট ব্যাংককে নতুন গ্রাহক যোগ করা থেকে বিরত থাকতে নির্দেশ দিয়েছে। পাশাপাশি পেটিএমের পেমেন্ট ব্যাংকের আইটির অডিট করারও নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এতে কোম্পানির শেয়ারে আরো দরপতন হয়েছে। এমনকি পেটিএমের শেয়ারের দর আরো কমার ইঙ্গিত দিচ্ছে ম্যাককুইরে ও জেপি মরগ্যানের মতো প্রতিষ্ঠানও। এরই মধ্যে গত মে মাসে পেটিএম মূলধন কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে কোম্পানির মূলধন এবং বিনিয়োগকারীদের সঠিক ভারসাম্য থাকবে বলে মনে করছে কোম্পানিটি।
পেটিএমের শেয়ারদরে ধস নামার পর ভারতজুড়ে স্টার্টআপ কোম্পানিগুলোর আইপিও নিয়ে জোর সমালোচনা চলছে। ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ইনফোসিসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এন আর নারায়ণমূর্তি সংবাদমাধ্যমকে বলেন, এভাবে শেয়ার বিক্রিকে শুধু ব্যবসার পরের ধাপের টাকা জোগাড়ের পথ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এ মানসিকতা ঠিক নয়। আইপিওতে শেয়ারে দাম নির্ধারণ করা উচিত ভবিষ্যতের বাজার সম্পর্কে সঠিক মূল্যায়ন করে। কিন্তু ভারতে সেটা দক্ষভাবে করার মতো মূল্যায়ন সংস্থার অভাব রয়েছে। তার কথায়, আইপিওকে শুধু ব্যবসার মূলধন সংগ্রহের মাধ্যম হিসেবে দেখা ভুল। লগ্নিকারীদের থেকে অর্থ সংগ্রহ করে তাদের কথা ভুলে গেলে চলবে না।


