বাংলাদেশের বীমা খাতের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়
মীর তাসিন ইশমাম আহমেদ :
বীমা একটি সার্বজনীন বিষয়। বীমা মানব জীবনের পরম বন্ধু। শুধু তাই নয় বীমা মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরপত্তার জন্য সমান তালে কাজ করে থাকে।
মানুষের সাধারণ জীবনের ঝুঁকির পাশাপাশি দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতি, গ্রুপ বীমা, স্বাস্থ্যের বীমা ছাড়াও বিশেষ বিশেষ কতগুলো রোগ বালাই এর জন্য ডাক্তার দেখানো থেকে শুরু করে হাসপাতালে ভর্তি ও চিকিৎসাসহ সকল কিছুই লাইফ বীমা কোম্পানী গ্রহণ করে থাকে। তাছাড়া সন্তানদের লেখা পড়া, বিয়ে সাদী এবং বৃদ্ধ বয়সে পেনশনের ব্যবস্থাও জীবন বীমা বা লাইফ পলিসি থেকে পাওয়া যায়। তাই বাবা প্রায়শঃ বলেন টিভি, বিজ্ঞাপনে অনেক আগে প্রচার হতো “সুখে দুঃখে আপনজন জীবন বীমা কর্পোরেশন” শুনতে বড়ই মধুর লাগতো।
আবার মানুষের পরিশ্রমের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসা বাণিজ্য, কলকারখানা, ব্যক্তি ও মালামাল পরিবহনে ব্যবহৃত গাড়ী, মালামাল ও যাত্রী পরিবহনে ব্যবহৃত জাহাজ, বিমান, হেলিকপ্টার ইত্যাদির নিরাপত্তা বিধানের জন্য সাধারণ বীমা বা নন-লাইফ বীমা পলিসি রয়েছে। আরো রয়েছে এক্সপোর্ট গ্যারান্টি স্কীম বীমা যা দ্বারা এক্সপোর্টারগণ উপকৃত হয়ে থাকেন।
যদিও মানব জীবন ও তাঁর অর্জিত সম্পদের নিরাপত্তা দেয়া বীমার কাজ। কিন্তু এখনো তেমন সচেতন জনগোষ্ঠী আমাদের দেশে গড়ে ওঠেনি। জীবন বীমা এখনো আমরা ইনকামটেক্স রিবেট পাওয়ার জন্য আর সাধারণ বীমা ব্যাংক ঋণের কারণে করে থাকি।
আমরা কখনো ভেবে দেখি না যে, আমাদের অবর্তমানে আমাদের পরিবারের কেউ হাসপাতালে ভর্তির কারণে যে পরিমান চিকিৎসা খরচ হতে পারে তা আমাদের সঞ্চিত আছে কিনা? আমাদের পরিবার সে খরচ করার সামর্থ রাখে কিনা? আবার আমাদের সারা জীবনের পরিশ্রমের বিনিময়ে অর্জিত সম্পদ যে কোন সময় দুর্ঘটনায় পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যেতে পারে। যদি সঠিকভাবে বীমা করা না থাকে তবে পথে বসতে হবে। লোকের দুয়ারে দুয়ারে বাঁচার জন্য ধর্না দিতে হবে। তাই বীমা সচেতনতা অত্যাবশ্যক।
সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বীমা শিক্ষা পাঠ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। শিক্ষিত ছাত্র ছাত্রীরাই সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধিতে ভালো কাজ করতে পারে। তাছাড়া বীমা বিষয়ে বিভিন্ন সেমিনারের আয়োজন ও বীমা কোম্পানীগুলোতে কর্মরত জনশক্তিকে বিভিন্ন ট্রেনিং এর মাধ্যমে বীমা কি এবং কেন তা জানতে উদ্বৃদ্ধ করতে হবে। বীমা কোম্পানীতে কর্মরত লোকজন অনেকেরই বীমা পলিসি সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারনা নেই। তাই, তাঁরা বীমা গ্রহীতাদের বীমার সুবিধাদি বুঝাতে সমর্থ নহেন। এই বিষয়টি বিশেষ বিবেচনায় নিয়ে বীমা সংশ্লিষ্ট সকলকে বীমা পলিসির শর্তাবলী সম্পর্কে জানার তা কাষ্টমারকে এবং বলার উপযোগী করে তৈরী করতে হবে।
আমাদের দেশে সরকারীভাবে বীমা একাডেমী রয়েছে কিন্তু বীমায় যারা কাজ করেন তাদের একাডেমী থেকে প্রাপ্ত ডিগ্রীকে গুরুত্ব না দিয়ে বিদেশী ডিগ্রীকে গুরুত্ব দেয়া হয়, যা অনভিপ্রেত। দেশের বীমা শিল্পের স্বার্থে প্রয়োজনে বীমা একাডেমীকে ঢেলে সাজাতে হবে। দেশীয় সরকারী বীমা একাডেমী থেকে প্রাপ্ত ডিগ্রীধারী শিক্ষিত পেশাজীবি কিভাবে সৃষ্টি হবে তা ভেবে দেখার সময় এসেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং এন্ড ইন্স্যুরেন্স ডিপার্টম্যান্টের সিলেবাসে বীমা সম্পর্কীয় আরো বেশী বিষয়বস্তু সংযোজন করা প্রয়োজন। বীমা সচেতনায় শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের কোন বিকল্প নেই।
বিদেশে প্রতিটি ক্ষেত্রে বীমা ছাড়া চলা দুষ্কর। সরকার বীমার পক্ষে কাজ করে থাকেন কিন্তু আমরা আমাদের দেশে এর প্রচার ও প্রসার ঘটাতে পারিনি, এটা আমাদের ব্যর্থতা। আমাদের এই সংকট থেকে উত্তরণে বিশ্বাস ও আস্থার ক্ষেত্রটা তৈরীতে সরকার, নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ, মালিক সকলের সদিচ্ছার সম্মিলন ঘটাতে হবে।
সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী বঙ্গবন্ধু ১৯৬০ সালের ১লা মার্চ আলফা বীমায় যোগদান করে দেশ মাতৃকার উন্নয়নে বাংলার মানুষকে একত্রিত করে বীমা শিল্পকে আলোর পথ দেখিয়েছিলেন আর দুর্বার আন্দোলনের মাধ্যমে পাকিস্তান সরকারের দুর্গকে কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন। আজ তাঁরই উত্তরসূরী হয়েও আমরা দেশের রাজস্ব আয়ে তেমন কোন ভূমিকা পালন না করে তা ধ্বংসের পথে নিয়ে যাচ্ছি। যা নীতি, নৈতিকতা, বিবেক ও মানবতার পরিপন্থী।
বীমা শিল্পে বঙ্গবন্ধুর কাজের কারণে একমাত্র বীমাই একটি “জাতীয় দিবস” পেয়েছে যা ২০২০ সাল থেকে প্রতি বছর ১লা মার্চ “বীমা দিবস” হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। অন্য কোন সেক্টর কিন্তু এই সুবিধা পায়নি।
এই উপমহাদেশে ১৮১৮ সনে ওরিয়েন্টাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স দিয়ে বীমা যাত্রা শুরু হয়। বীমা শিল্পে কাজের অভিজ্ঞতায় দেশ স্বাধীন হবার পর ১৯৭২ সনে ৮ই আগস্ট ন্যাশনালাইজেশন এক্টের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু সকল বীমা কোম্পানী জাতীয়করণ করেন। কারণ ঐ সময় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী পাট, তুলা ইত্যাদিতে আগুন লাগিয়ে মুনাফা লুটায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তাঁর প্রজ্ঞা ও বিচক্ষনতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি বীমা ব্যবসাকে ১৯৭৩ সালের ১৪ই মে সাধারণ বীমা কর্পোরেশন ও জীবন বীমা কর্পোরেশন গঠনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন।
পরবর্তীতে মহামান্য প্রেসিডেন্ট হোসাইন মুহাম্মদ এরশাদ সাহেব ১৯৮৪ সালে জাতীয়করণ রহিত করে বেসরকারী খাতে বীমা শিল্পের অনুমোদন দেন এবং ১৯৮৫ সালে বেসরকারী খাতে ২৪টি সাধারণ বীমা ও ৫টি জীবন বীমা কোম্পানী কার্যক্রম শুরু করে। বর্তমানে বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় সাধারণ বীমা ও জীবন বীমা এবং ২টি বিদেশী জীবন বীমাসহ ৮১টি বীমা কোম্পানী কাজ করছে।
সরকার গতানুগতিক ধারা থেকে বের হয়ে এসে বিভিন্ন সংস্কার ও বিধি বিধান প্রণয়নের মাধ্যমে বীমাকে বেগবান করতে ২০১০ সনের ২৬শে জানুয়ারী বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ গঠন করেন।
একজন শিক্ষার্থী হিসাবে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বীমার উপর থিসিস তৈরীর সময় বিভিন্ন বীমা কোম্পানীতে কর্মরত লোকজনের সাথে আলাপ করে এই সেক্টরের যে অবস্থা বুঝতে পেরেছি তা আমাকে এই লেখায় অনুপ্রাণীত করেছে। আমার থিসিস তৈরীতে বীমা খাতের যে চ্যালেঞ্জ লক্ষ্য করেছি তা নি¤œরূপঃ
১। নির্দিষ্ট কোন নিয়ম নীতির মাধ্যমে কোম্পানীগুলো পরিচালিত হচ্ছে না। বিভিন্ন কোম্পানী তাদের মনগড়া নিয়মে চলছে।
২। অনেক বীমা কোম্পানীতে নৈতিকতার কোন স্থান নেই। যে যত অনৈতিক কাজ করতে পারে সেই তত বেশী পুরষ্কৃত হয়। তাই বীমা শিল্পে কর্মরত কর্মীদের মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে।
৩। পরিচালনা পর্ষদের অযাচিত প্রেসার। পরিচালকদের আর্থিক লোভ-লালসার কারণে বীমায় কর্মরতদের তাদের খুশী রাখার জন্য অন্যায় কাজে সম্পৃক্ত হতে হয়। ফলশ্রুতিতে কাউকে কাউকে শাস্তিও ভোগ করতে হয়।
৪। প্রতিনিয়ত লাইফ বীমা কোম্পানীগুলো থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাটের তথ্য বিভিন্ন সময় মিডিয়ায় প্রচার হওয়ার বীমার প্রতি মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসের সংকট আজ দৃশ্যমান।
৫। উপযুক্ত মূখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা পাওয়া যায় না বলে অযোগ্য এবং মালিকদের আজ্ঞাবহ মুখ্য নির্বাহীদের বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ নিয়োগ দিয়ে ক্ষেত্র বিশেষে এক্সটেনশন দিচ্ছেন এটা ভেবে দেখার সময় এসেছে।
৬। প্রকৃত যারা অপরাধী বা যারা বীমা ব্যবসার ইমেজ নষ্ট করছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষকে তাদের শাস্তির উদ্যোগ নিতে হবে।
৭। বীমা সেক্টরের অরাজতা বন্ধে কর্মীদের মানসিক স্বস্থির জন্য ব্যবস্থা না করে কর্মী ছাঁটাই বীমা শিল্পের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে।
৮। অতিরিক্ত কমিশনের কারণে নন-লাইফ বীমা কোম্পানীগুলোর ঠিক মতো দাবী পরিশোধ এবং পুন:বীমাকারীর কাছ থেকে যথার্থ সহযোগীতা না পাওয়ার কারণে দাবী নিষ্পত্তি করা দুরূহ হয়ে পড়েছে।
৯। করোনাকালীন সময়ে সরকার ও কোম্পানীগুলো বীমা কর্মীদের জন্য কোন প্রনোদনার ব্যবস্থা করতে পারেনি। যা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলো পেরেছে, এটাও এই পেশার একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
১০। অনেক বীমা কর্মী করোনার কারণে ব্যবসা সংগ্রহ করতে না পারায় মানবেতর জীবন যাপন করেছেন এবং এখনো করছেন।
১১। জাতীয় বীমা নীতির কর্ম পরিকল্পনায় বীমায় সচেতনা বৃদ্ধির কার্যকর পদক্ষেপের কথা বলা থাকলেও তেমন দৃশ্যমান অগ্রগতি এখনো লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।
১২। সার্ভে কোম্পানীগুলোতে বীমা বিষয়ে উচ্চ শিক্ষিত ও সকল ক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত দক্ষ লোকের অভাব রয়েছে।
উত্তরণের উপায়ঃ
১। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে যোগ্য মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়োগের ব্যবস্থা নিতে হবে।
২। বীমা কোম্পানীগুলোর সঠিক সময়ে বীমা গ্রহীতাদের প্রাপ্য দাবীর অর্থ পরিশোধ করার ব্যাপারে কোম্পানীগুলোও পুন:বীমাকারীকে বাধ্য করার জন্য বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষকে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে।
৩। বীমা কোম্পানীর অর্থ হরিলুটের বাতাসার মতো ভাগ করে খাওয়া বন্ধের উদ্যোগ নিতে হবে।
৪। আজ বীমায় যে ইমেজ সংকট তৈরী হয়েছে তা থেকে পরিত্রাণের একমাত্র উপায় হিসাবে বীমা কোম্পানীগুলোর ভিতর এবং বাইরে শৃংখলা ফিরিয়ে আনতে হবে।
৫। গ্রাহক হয়রানি না করে গ্রাহক বান্ধব পরিবেশ তৈরী করতে কোম্পানীগুলোকে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষকেই সরকারের হয়ে উদ্যোগ নিতে হবে।
৬। কর্তৃপক্ষকে সকল প্রতিবন্ধকতা থেকে বের হয়ে সকলের প্রতি একই রকম আচরণ বিধি মেনে দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন করতে হবে। এই ব্যাপারে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগকেও শক্ত ভূমিকা নিতে হবে।
৭। নন-লাইফবীমার দাবী নিষ্পত্তিতে সার্ভে ফার্মের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে তাই তাদের লাইসেন্স প্রদানের পূর্বে বীমা বিষয়ে যথাযথ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ আছে কিনা তা নিশ্চিত হতে হবে।
৮। সবশেষে বীমার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস ফিরিয়ে আনার জন্য বীমা সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটি, সাধারণ জনগণ, কল-কারখানায় কর্মরত কর্মীদের জন্য সংবাদপত্র, টিভি চ্যানেল, রেডিও, ফেসবুক, সোস্যাল মিডিয়ায় বীমার সুবিধাদি প্রচারের পদক্ষেপ নিতে হবে।
বীমা শিল্পের সকল নেতিবাচক দিকগুলো পরিহার করে সত্য সুন্দর, প্রত্যয়দীপ্ত বাংলাদেশ গঠনে ঐক্যবদ্ধভাবে বীমা সংশ্লিষ্ট সকলকে একযোগে কাজ করতে হবে।
লেখকঃ মীর তাসিন ইশমাম আহমেদ
শিক্ষার্থী, নর্থ-সাউথ ইউনিভার্সিটি, ঢাকা।


