down of head

ফের অ্যাগ্রিগেটস উৎপাদন শুরু করেছে লাফার্জহোলসিম

উচ্চ আদালতের রায় পাওয়ার পর ফের চুনাপাথর চিপ বা অ্যাগ্রিগেটস উৎপাদন শুরু করেছে লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ লিমিটেড। পণ্যটির উৎপাদন ও বিপণন বন্ধে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টের রিট পিটিশন দায়ের করে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত সিমেন্ট খাতের বহুজাতিক কোম্পানিটি। গত বুধবার এর নিষ্পত্তি হওয়ায় ওই দিন থেকেই আবারো পণ্যটির উৎপাদন শুরু করেছে কোম্পানিটি। স্টক এক্সচেঞ্জ সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশের চিফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার ও মানবসম্পদ পরিচালক আসিফ ভূঁইয়া এ বিষয়ে বলেন, হাইকোর্ট বিভাগ আমাদের অ্যাগ্রিগেটস অপারেশনস পুনরায় শুরু করার বিষয়ে কোম্পানির অনুকূলে রায় দিয়েছেন। আদালত পূর্ণাঙ্গ শুনানি ও পর্যবেক্ষণের পর কোম্পানির অপারেশন পরিচালনার পক্ষে এ রায় দেন। আমরা বিশ্বাস করি, এ রায় দেশে বিদেশী বিনিয়োগে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। আমাদের দেশে অ্যাগ্রিগেটসের চাহিদার তুলনায় জোগান সামান্য। এর পুরোটাই আমদানি করতে হয়। স্থানীয়ভাবে এর উৎপাদনের ফলে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। রাজস্ব বৃদ্ধি পাবে। পণ্যটির জোগান নিশ্চিত হবে।

এর আগে অ্যাগ্রিগেটস উৎপাদন ও ব্যবসা বন্ধের নির্দেশ দিয়ে গত বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর লাফার্জহোলসিমকে চিঠি দেয় শিল্প মন্ত্রণালয়। নির্দেশনা-সংক্রান্ত চিঠিটি তারা হাতে পায় ২০ সেপ্টেম্বর। ব্যবসা বন্ধের নির্দেশনার কারণ হিসেবে চিঠিতে বলা হয়, লাফার্জহোলসিম সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেয়নি। এ চিঠি হাতে পাওয়ার পর পরই আইনি পদক্ষেপ নেয় কোম্পানিটি। মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয় তারা। শুনানি শেষে গত ১৬ নভেম্বর শিল্প মন্ত্রণালয়ের চিঠির কার্যকারিতা এক মাসের জন্য স্থগিত করে রায় দেন হাইকোর্ট। এ আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে পুনরায় অ্যাগ্রিগেটসের উৎপাদন ও বিপণন শুরু করেছিল লাফার্জহোলসিম। পরে এ আদেশের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের চেম্বার জজের আদালতে আপিল করে শিল্প মন্ত্রণালয়। আপিল শুনানি শেষে গত ২৩ নভেম্বর চেম্বার জজের আদালত শিল্প মন্ত্রণালয়ের চিঠির কার্যকারিতা স্থগিত করাসংক্রান্ত হাইকোর্টের রায়ের কার্যকারিতা দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিত থাকবে বলে রায় দেন। ফলে ২৩ নভেম্বর থেকেই কোম্পানিটির অ্যাগ্রিগেটস উৎপাদন আবারো বন্ধ হয়ে যায়।

গত বছরের শুরুতে আন্তর্জাতিক মানের অ্যাগ্রিগেটসের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করে লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ। এসব চুনাপাথর চিপের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এগুলো ক্লিয়ার সাইজের ও গ্রেডেড চিপ। অর্থাৎ এসব চিপের সব আকার ও আকৃতি একই, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অর্জনের অন্যতম শর্ত। সুনামগঞ্জের ছাতকে অবস্থিত কোম্পানিটির ক্লিংকার ও সিমেন্ট উৎপাদন কারখানা প্রাঙ্গণেই এ চুনাপাথর চিপ ক্রাশিং ইউনিটটি স্থাপন করা হয়। ইউনিটটি বছরে ১২ লাখ টন কোণ আকৃতির চুনাপাথর চিপ উৎপাদন করতে সক্ষম। এ ইউনিট স্থাপনে কোম্পানিটির নিজস্ব তহবিল থেকে ৪০ কোটি ১০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে।

চুনাপাথর চিপের ব্যবসা থেকে কোম্পানিটি এখন পর্যন্ত ভালো আয় করেছে। পণ্যটির কারণে চলতি ২০২১ হিসাব বছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) ভালো ব্যবসা করেছে লাফার্জহোলসিম। সিমেন্ট ও চুনাপাথর চিপের ব্যবসা থেকে ভালো আয় হওয়ার কারণে আলোচ্য সময়ে কোম্পানিটির বিক্রি বেড়েছে। সব মিলিয়ে নয় মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কোম্পানিটির বিক্রি বেড়েছে ৩৭ শতাংশ।

সর্বশেষ অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, চলতি হিসাব বছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে লাফার্জহোলসিমের বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকা। যেখানে আগের বছরের একই সময়ে বিক্রি ছিল ১ হাজার ১৪২ কোটি টাকা। তিন প্রান্তিকে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী নিট মুনাফা হয়েছে ৩০৯ কোটি টাকা। যেখানে এর আগের বছরের একই সময়ে নিট মুনাফা হয়েছিল ১৫০ কোটি টাকা। সে হিসাবে কোম্পানিটির নিট মুনাফা বেড়েছে ১০৬ শতাংশ। আলোচ্য সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি সমন্বিত আয় (ইপিএস) হয়েছে ২ টাকা ৬৬ পয়সা। আগের হিসাব বছরের একই সময় যা ছিল ১ টাকা ২৯ পয়সা।

অন্যদিকে তৃতীয় প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) কোম্পানিটির বিক্রি হয়েছে ৪৬০ কোটি টাকা। যেখানে এর আগের বছরের একই সময়ে বিক্রি ছিল ৩৬৫ কোটি টাকা। সে হিসাবে তৃতীয় প্রান্তিকে কোম্পানিটির বিক্রি বেড়েছে ২৬ শতাংশ।

আলোচ্য প্রান্তিকে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী নিট মুনাফা হয়েছে ৯৪ কোটি টাকা। যেখানে এর আগের বছরের একই সময়ে নিট মুনাফা হয়েছিল ৬৫ কোটি টাকা। সে হিসাবে কোম্পানিটির নিট মুনাফা বেড়েছে ৪৩ শতাংশ। আর চলতি হিসাব বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে ইপিএস হয়েছে ৮১ পয়সা, যেখানে এর আগের বছরের একই সময়ে ইপিএস ছিল ৫৬ পয়সা। ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২১ শেষে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য (এনএভিপিএস) দাঁড়িয়েছে ১৬ টাকা ৬১ পয়সা।

সর্বশেষ ৩১ ডিসেম্বর ২০২০ সমাপ্ত হিসাব বছরের জন্য শেয়ারহোল্ডারদের ১০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ। আলোচ্য সময়ে কোম্পানিটির সমন্বিত ইপিএস হয় ২ টাকা ৩ পয়সা, আগের হিসাব বছরের একই সময়ে যা ছিল ১ টাকা ৫০ পয়সা। ৩১ ডিসেম্বর ২০২০ শেষে কোম্পানিটির সমন্বিত এনএভিপিএস দাঁড়ায় ১৪ টাকা ৮৯ পয়সা, আগের হিসাব বছর শেষে যা ছিল ১৩ টাকা ৯৫ পয়সা।

২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর সমাপ্ত হিসাব বছরেও শেয়ারহোল্ডারদের ১০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছিল লাফার্জহোলসিম। তার আগের চার হিসাব বছরেও একই হারে নগদ লভ্যাংশ পেয়েছিলেন কোম্পানিটির শেয়ারহোল্ডাররা।

২০০৩ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিটির অনুমোদিত মূলধন ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। পরিশোধিত মূলধন ১ হাজার ১৬১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। রিজার্ভে রয়েছে ৫৬৭ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। কোম্পানির মোট শেয়ার সংখ্যা ১১৬ কোটি ১৩ লাখ ৭৩ হাজার ৫০০। এর মধ্যে ৬৪ দশমিক ৬৮ শতাংশ উদ্যোক্তা-পরিচালক, ১৫ দশমিক ৮৪ শতাংশ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী, দশমিক ৭৫ শতাংশ বিদেশী বিনিয়োগকারী ও বাকি ১৮ দশমিক ৭৩ শতাংশ শেয়ার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে রয়েছে।

ডিএসইতে গতকাল লাফার্জহোলসিমের শেয়ারের সর্বশেষ ও সমাপনী দর ছিল ৮১ টাকা ৫০ পয়সা। গত এক বছরে শেয়ারটির দর ৪৩ টাকা ৮০ পয়সা থেকে ১০৭ টাকা টাকা ৫০ পয়সার মধ্যে ওঠানামা করে।

সর্বশেষ নিরীক্ষিত ইপিএস ও বাজারদরের ভিত্তিতে এ শেয়ারের মূল্য আয় (পিই) অনুপাত ৪০ দশমিক ১৫, হালনাগাদ অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে যা ২২ দশমিক ৯৮।

সম্পর্কিত খবর