ফিলিপাইন ব্ল্যাক আখ চাষে ১০ লাখ আয়ের স্বপ্ন

দীর্ঘদিন প্রবাসজীবন কাটিয়ে দেশে ফিরে অনেকেই যখন কর্মসংস্থানের সংকটে দিশেহারা, ঠিক তখনই একদম উল্টো এক রূপকথা লিখছেন ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার মো. জুয়েল (৪০)। প্রবাসের পাট চুকিয়ে তিনি বেছে নিয়েছেন প্রথাগত কৃষির বদলে আধুনিকতার স্পর্শ। উপজেলার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিকভাবে চাষ করেছেন উচ্চ ফলনশীল ও লাভজনক ‘ফিলিপাইন ব্ল্যাক’ জাতের আখ। আর তাতেই চরফ্যাশনের কৃষিতে উন্মোচিত হয়েছে এক নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত।

​একসময় অবহেলায় পড়ে থাকা জুয়েলের মাত্র ৩০ শতাংশ জমিই এখন তার স্বপ্নপূরণের মূল মঞ্চ। সেখানে তিনি গড়ে তুলেছেন দৃষ্টিনন্দন এক আখের বাগান। সবুজ আর কালচে রঙের মিশেলে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় ৬ হাজার ফিলিপাইন ব্ল্যাক আখের চারা। শুরুতে দেশীয় জাতের আখ চাষের পরিকল্পনা থাকলেও মোড় ঘুরে যায় উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরামর্শে। মাদ্রাজ ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা এমাজ উদ্দীনের বুদ্ধিতেই জুয়েল বেছে নেন অধিক লাভজনক ও বাণিজ্যিকভাবে তুমুল সম্ভাবনাময় এই জাত।

​কৃষি বিভাগের সার্বিক তত্ত্বাবধানে প্রদর্শনী প্লট হিসেবে জুয়েলের এই যাত্রা শুরু হয়। জমি ভরাট, চারা সংগ্রহ, সুষম সার ও নিয়মিত পরিচর্যাসহ এ পর্যন্ত তার খরচ হয়েছে আড়াই লাখ টাকার মতো। নিজের এই সাফল্য নিয়ে উচ্ছ্বসিত জুয়েল জানান, প্রবাস থেকে ফিরে ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি চরম দুশ্চিন্তায় ছিলেন। তবে কৃষি বিভাগের সঠিক দিকনির্দেশনায় আখ চাষ শুরু করার পর সেই সংকট কেটে গেছে। মাঠজুড়ে আখের বাম্পার বৃদ্ধি দেখে এখন তিনি দারুণ আশাবাদী। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে প্রথম মৌসুমেই প্রায় ১০ লাখ টাকার আখ বিক্রি করা সম্ভব হবে। এখানে সফল হলে সামনে আরও বড় পরিসরে জমি লিজ নিয়ে আখ চাষ বাড়াবেন এবং এলাকার বেকার যুবকদেরও এই লাভজনক কৃষিতে আসার পরামর্শ দিচ্ছেন তিনি।

​উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা এমাজ উদ্দীন জানান, দ্রুত বৃদ্ধি ও উচ্চ ফলনই এই আখের প্রধান বৈশিষ্ট্য। মাত্র আট মাস আগে রোপণ করা চারাগুলো ইতোমধ্যে প্রায় ১০ ফুট উচ্চতায় পৌঁছেছে। আর দুই মাসের মধ্যেই এগুলো বাজারজাতকরণের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে যাবে। চরফ্যাশন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ নাজমুল হুদা জানান, এই জাতের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো একবার চারা রোপণ করলে টানা তিন বছর পর্যন্ত সমান ফলন পাওয়া যায়। বারবার চারা কেনা বা জমি প্রস্তুতের প্রয়োজন না থাকায় দ্বিতীয় ও তৃতীয় বছরে উৎপাদন খরচ এক ধাক্কায় অনেক কমে আসে, যা কৃষকের নিট মুনাফা বাড়িয়ে দেয় বহু গুণ।

​চরফ্যাশনের আবহাওয়া ও মাটি এই আখ চাষের জন্য দারুণ উপযোগী। ফলন ও বাজারমূল্য ভালো পাওয়ায় এটি দ্রুতই অঞ্চলের একটি বড় অর্থকরী ফসল হিসেবে জায়গা করে নেবে বলে আশাবাদ কৃষি বিভাগের। জুয়েলের এই অভাবনীয় সাফল্য ইতোমধ্যে স্থানীয় কৃষকদের মাঝে ব্যাপক কৌতূহল তৈরি করেছে। প্রতিদিন আশেপাশের অনেক মানুষ আসছেন তার দৃষ্টিনন্দন আখের ক্ষেত দেখতে এবং পরামর্শ নিতে। সঠিক দিকনির্দেশনা আর আধুনিক চিন্তাকে কাজে লাগিয়ে পরিত্যক্ত জমিতেও যে আয়ের নতুন পথ তৈরি করা যায়, ওমানফেরত জুয়েল এখন তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

সম্পর্কিত খবর