অর্থায়নে নতুন উদ্যোগ, আসছে ডলার বন্ড
অর্থায়নের উৎস বহুমুখী করতে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারে সার্বভৌম ডলার বন্ড ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ। এর মাধ্যমে ৫০ কোটি থেকে ১০০ কোটি ডলার সংগ্রহের লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।
এই বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো বৈশ্বিক বাজারে বৈদেশিক মুদ্রায় সার্বভৌম ঋণপত্র ছেড়ে অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ নিচ্ছে বাংলাদেশ। সরকারের অলটারনেটিভ ফাইন্যান্সিং কমিটির কাছ থেকে বন্ডের আকার ও ইস্যুর শর্তাবলির চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়া সাপেক্ষে চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে এটি ইস্যু করার আশা করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারবিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর শাহরিয়ার এক গণমাধ্যমে বলেন, বিদেশি পুঁজিবাজারে ডলার বন্ড ইস্যুর পরিকল্পনা করা হয়েছে এবং বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ভালো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে বন্ডটি ইস্যু করা হতে পারে।
আন্তর্জাতিক বাজারে সার্বভৌম বন্ড ইস্যুর বিষয়টি পর্যালোচনা এবং অর্থায়নের বিকল্প উৎস নিশ্চিত করার উপায় সুপারিশ করতে অর্থ মন্ত্রণালয় গত জুলাইয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে। কমিটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন তানভীর শাহরিয়ার গনি। কমিটি গঠনের পর কয়েকটি বৈঠক হয়েছে এবং ডলার-নির্ধারিত বন্ড ইস্যুর বিষয়ে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে বন্ডের চূড়ান্ত আকার এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।
কমিটি উদীয়মান দেশগুলোর সরকার ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের আন্তর্জাতিক বন্ডের কার্যকারিতা পর্যালোচনার জন্য জেপি মরগানের তৈরি বেঞ্চমার্ক ইমার্জিং মার্কেটস বন্ড ইনডেক্সে অন্তর্ভুক্তির যোগ্যতার শর্তও পর্যালোচনা করেছে। এতে দেখা গেছে, যোগ্য ঋণপত্রের বকেয়া অভিহিত মূল্য ৫০ কোটি ডলারের বেশি হতে হবে।
বাংলাদেশ এর আগে আন্তর্জাতিক বাজারে সার্বভৌম বন্ড ইস্যু করে মূলধন সংগ্রহ করেনি। তবে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে বাজেট সহায়তা ও বিভিন্ন প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য ঋণ নিয়ে থাকে।
ডলার বন্ডের পাশাপাশি অন্যান্য মুদ্রা ও ধরনের বন্ড-সুকুক, পান্ডা, সামুরাই ও ডিমসাম বন্ড নিয়েও আলোচনা চলছে। তানভীর শাহরিয়ার বলেন, বাংলাদেশকে বিকল্প অর্থায়নের দিকে যেতে হবে। বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে অর্থায়নের নতুন উৎস যুক্ত হবে।
ডলার বন্ডের বিষয়ে তিনি বলেন, ডলারে বন্ড ছেড়ে মূলধন সংগ্রহ করতে পারলে অন্যান্য মুদ্রায় বন্ড ইস্যু করা সহজ হবে। এতে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ইতিবাচক বার্তা যাবে এবং অন্যান্য বন্ডের মাধ্যমেও মূলধন সংগ্রহ সহজ হতে পারে।
তিনি জানান, ডলার বন্ডের পর সুকুক, সামুরাই, অবকাঠামো ও প্রবাসী বন্ড ইস্যুর পরিকল্পনাও রয়েছে। ডলার বন্ডের মাধ্যমে বিকল্প অর্থায়নের যাত্রা শুরু হলে অন্যান্য বন্ড ইস্যুও সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের আট সদস্যের কমিটি বিভিন্ন বৈদেশিক মুদ্রা ও আন্তর্জাতিক বাজারে সার্বভৌম বন্ড ইস্যুর সম্ভাব্যতা যাচাই করছে। ভবিষ্যতে বন্ড ইস্যুর আকার, মুদ্রা ও বাজারের পাশাপাশি মেয়াদ, সুদহারের কাঠামো, ইস্যুর সময় এবং অন্যান্য আর্থিক ও কারিগরি বিষয়ে সুপারিশ করবে কমিটি।
বন্ড ইস্যুর জন্য সরকারের অলটারনেটিভ ফাইন্যান্সিং কমিটির অনুমোদন প্রয়োজন হবে। সরকারের অর্থায়নের বিকল্প উৎস চিহ্নিত করা এবং আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তহবিল সংগ্রহের সুযোগ যাচাইয়ের দায়িত্বও রয়েছে এ কমিটির ওপর।
তানভীর বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয়ের কমিটি গঠনের পর থেকেই বন্ড ইস্যুর কাজ চলছে এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রস্তুত করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ মূলত খুব দরিদ্র দেশগুলোকে সহায়তা করার জন্য গড়ে উঠেছিল। বাংলাদেশের মতো প্রবৃদ্ধির পর্যায়ে থাকা একটি দেশের অর্থায়নের বিকল্প উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো প্রয়োজন।
গত জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের আগে বাংলাদেশকে পান্ডা বন্ড ইস্যুর প্রস্তাব দেয় চীন সরকার। সফরের আগে চীনের একটি প্রতিনিধিদল ঢাকায় এসে বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে এ বিষয়ে বৈঠক করে।
প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের সময় প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে পান্ডা বন্ড চালুর উদ্যোগ এগিয়ে নিতে বাংলাদেশ ও চীন সম্মত হওয়ার কথা জানানো হয়।
চলতি মাসের শুরুতে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে সরকারের অলটারনেটিভ ফাইন্যান্সিং কমিটির বৈঠকেও পান্ডা বন্ডসহ বৈদেশিক মুদ্রায় সার্বভৌম বন্ড ইস্যুর বিষয়টি আলোচনা হয়।
বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান ৫ কোটি ডলারের পান্ডা বন্ড ইস্যুর বিষয়ে প্রাথমিকভাবে সমর্থন জানান। তবে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী বলেন, সম্ভাব্য পান্ডা বন্ড ইস্যুতে চীন সহায়তা দিতে আগ্রহী হলেও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল এ বিষয়ে আপত্তি তুলতে পারে।
পরে পান্ডা বন্ডসহ বৈদেশিক মুদ্রায় সার্বভৌম বন্ড ইস্যুর বিষয়টি পর্যালোচনার জন্য একটি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়।



