ভারত থেকে অনুপ্রবেশ, সীমান্তে নজরদারি বৃদ্ধি করেছে বাংলাদেশ

বাংলাদেশের ছয়টি জেলার সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে অনুপ্রবেশ বাড়ছে৷ গত এক মাসে প্রায় ছয়শ নারী, পুরুষ ও শিশুকে আটক করে থানায় দেয়া হয়েছে৷

বিজিবি বলছে তারা বাংলাদেশি কীনা তা যাচাই করা সম্ভব হচ্ছে না৷ তবে ভাষাগত কিছু সমস্যা থাকায় নিশ্চিত এরা আসামের অধিবাসী। ভারত থেকে অনুপ্রবেশ বাড়ায় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)৷

স্থানীয় লোকজনকেও সতর্ক করে দেয়া হয়েছে তথ্য দেয়ার জন্য৷

বিজিবি সূত্র জানায়, সীমান্ত জেলা যশোর, ঝিনাইদহ, সাতক্ষীরা, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর ও কুষ্টিয়ার বিভিন্ন এলাকা দিয়ে এই অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটছে৷

সবচেয়ে বেশি অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটছে ঝিনাইদহের মহেশপুর সীমান্ত থেকে৷ গত এক মাসে সেখান দিয়ে অনুপ্রবেশের সময় ২৬০ জনকে আটক করা হয়৷ আর অন্য সীমন্ত থেকে আটক করা হয় ২৫১ জনকে৷ এই পাঁচ শতাধিক নারী পুরুষের বিরুদ্ধে থানায় পাসপোর্ট আইনে মামলা হয়েছে৷ কারণ তারা পাসপোর্ট ভিসা ছাড়াই বাংলাদেশ অনুপ্রবেশ করেছেন৷

বেনাপোল বন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মামুন খান ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আগের চেয়ে অনুপ্রবেশ অনেক বেড়েছে৷ আমার থানায় গত মাসে ৫৬ জনকে হস্তান্তর করেছে বিজিবি৷ এরা বেশির ভাগই বাগেরহাট, মোড়েলগঞ্জ, শরণখোলা ও মোংলা এলাকার বাসিন্দা বলে আমাদের জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন তবে কোন প্রমাণ দিতে পারেনি৷ তারা ভারতের কর্নাটকের ব্যাঙ্গালুরু ও কেরালা এলাকায় বাসা বাড়িতে কাজের জন্য গিয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন।

তবে বিজিবি বলছে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে দাবি করলেও জাতীয় পরিচয়পত্র বা পাসপোর্ট কোনটাই তারা দেখাতে পারছে না৷ যে কারণে তারা বাংলাদেশের নাগরিক নয়।

৫৮ বিজিবির কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল কামরুল হাসান বলেন, ‘‘আগে প্রতিমাসে মহেশপুর সীমান্ত থেকে অনুপ্রবেশের সময় আমরা দুই-চার জনকে আটক করতাম৷ কিন্তু নভেম্বরে এই সংখ্যা ছিল ২৬০ জন৷ অনুপ্রবেশের সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে গত এক মাসে৷’’ তিনি বলেন, ‘‘যাদের আটক করা হয়েছে তারা নিজেদের বাংলাদেশের নাগরিক দাবি করছেন৷ কিন্তু স্বপক্ষে কোনো তথ্য প্রমাণ দেখাতে পারছেন না৷ এমনকি যেই এলাকার তারা বাসিন্দা ছিলেন বলে দাবি করছেন সেখানকার কোনো যোগাযোগ নম্বর তাদের কাছে নেই, বলতে পারছেন না জনপ্রতিনিধির নামও৷ এমনকি কোন আত্নিয়দেরও নাম বলতে পারছেননা।

তারা কেন আসছে জানতে চাইলে কামরুল হাসান বলেন, ‘‘তারা ভারতের যেসব এলকায় ছিলেন সেসব জায়গায় পুলিশের অভিযান বেড়ে গেছে৷ পুরো ভারতে এনআরসির কথা বলেছেন অমিত শাহ৷ এতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে বিশেষ করে মুসলিমদের মধ্যে৷’’ তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, আসামের নাগরিকপঞ্জিতে বাংলাভাষী যেসব হিন্দু মুসলিমের জায়গা হয়নি, অবৈধ ঘোষণা করা হলে তারাও বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করছে। এমন হতে পারে আমাদের নজরধারির বাইরে এর চেয়ে বেশী মানুষ ইতিমধ্যে বাংলাদেশে ডুকে গেছে!

‘‘তিনি আরও জানান আমাদের (সীমান্তের) পূর্বাঞ্চলে আসামের ঢল ঠেকানোর জন্য (বিজিবি সদস্যরা) কড়াকড়ি অবস্থায় আছে বাড়ানো হয়েছে বাড়তি সদস্য৷ তবে তারা ঘুরে সিলেট সীমান্ত বাদ দিয়ে ময়মনসিংহ,শেরপুর ও নেত্রকোনা সীমান্ত দিয়ে আসতে পারে, সেই আশঙ্কাও রয়েছে৷’’ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে তাই এইস সব সীমান্তেই নজরদারি ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে বলে জানান তিনি৷ সেই সাথে স্থানীয়দের সতর্ক করা হয়েছে যেঁ সন্দেহভাজন কাউকে দেখলেই যেন পুলিশ ও বিজিবিকে জানায়।
কামরুল হাসান বলেন, ‘‘যারা বাংলাদেশের নাগরিক বলে দাবি করছেন তারা যদি বাড়ি ঘর বিক্রি করে গিয়ে থাকেন তাহলে তারা এখানে উদ্বাস্তুতে পরিণত হবে৷ আবার নারীরা সেখানে যদি যৌনকর্মী হিসেবে কাজ করে থাকেন তাহলে সেটাও আমাদের জন্য একটা হুমকি৷ কারণ এইডস ছড়ানোর আশঙ্কা আছে৷’’

এদিকে, আসামের নাগরিকপঞ্জির কোনো প্রভাব বাংলাদেশে পড়বে না বলে দাবি করে আসছে সরকার৷ সম্প্রতি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন সিলেটে এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘‘ভারত সরকার ইতিমধ্যে বাংলাদেশকে আশ্বস্ত করেছে যে এনআরসির কারণে ভারত থেকে কাউকে বাংলাদেশে পুশইন করবে না৷’’ এর দুইদিন পর সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ‘‘সরকারের কাছে ভারত থেকে অনুপ্রবেশ সংক্রান্ত কোন তথ্য নেই৷ গণমাধ্যমেই তিনি এই খবর দেখেছেন৷’’ কিন্ত বাস্তবতা উল্টো বিশ্লেষকেরা বলছেন এতে করে রোহিঙ্গা থেকে বড় সমস্যা অপেক্ষা করছে বাংলাদেশের উপর। এখনই আন্তর্জাতিক মহলে বিষয়টি তুলা উচিৎ বাংলাদেশের।

এই মুহূর্তে সরকারের করণীয় কী এ বিষয়ে সাবেক রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল(অব.) শহিদুল হক বলেন, ‘‘পররাষ্ট্রমন্ত্রীতো বলেছেন তিনি অনুপ্রবেশের বিষয়টি সংবাদপত্রে দেখেছেন৷ এখন সরকারের উচিত হবে যারা এসেছেন তাদের নাগরিকত্ব যাচাই করা৷ যদি তারা আমাদের নাগরিক না হয় তাহলে ভারতের কাছে তাদের ফিরিয়ে নেয়ার জন্য বলা৷’’
তবে তিনি বলেন, ‘‘এর একটা বিপদের দিকও আছে যদি ভেরিফাই শুরু হয় তাহলে এনআরসির কারণে ওখান থেকে বাংলাভাষীদের ঢল শুরু হতে পারে৷ তাই প্রথম কাজ হলো আর যাতে কেউ না ঢুকতে পারে সেটা নিশ্চিত করা, সেজন্য সব ধরনের ব্যবস্থা নেয়া৷ তারপর অন্য প্রক্রিয়ায় কূটনৈতিকভাবে জোর দিতে হবে৷’’

আসামের নাগরিকপঞ্জি নিয়ে কিছু তথ্য-

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসন শেষে ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়৷ ঐ ঘটনায় লাখ লাখ মানুষ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়া শুরু করে৷১৯৪৮ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে অবাধ যাতায়াতের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়৷১৯৫১ আসাম রাজ্যের জন্য প্রথম নাগরিকপঞ্জি তৈরি করে ভারত সরকার৷

১৯৫৫ নাগরিকত্ব আইন কার্যকর হয়৷ জন্ম, উত্তরাধিকার ও নিবন্ধনসূত্রে ভারতের নাগরিকত্ব পাওয়ার নীতিমালা প্রণীত হয়৷১৯৬১ পূর্ব পাকিস্তানের লাখ লাখ মানুষকে আসাম ছেড়ে পূর্ব পাকিস্তানে চলে যেতে বাধ্য করা হয়। আসামে তাদের নিয়ে গিয়েছিল তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার পাকিস্তান এদের গ্রহণ করে।১৯৬৪ পূর্ব পাকিস্তানে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার কারণে বাঙালি হিন্দুরা ভারতে চলে যান৷১৯৬৫ ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের কারণে হিন্দুরা পশ্চিম বাংলা ও আসামে চলে যায়।

১৯৭১ স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হয়৷ এই সময় নতুন করে আরও শরণার্থী ভারতে চলে যান বিশেষ করে তারা যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে বাঁচতে এদের প্রায় সকলেই মুসলিমরা বাংলাদেশে পরে চলে আসে। ১৯৮৩ লালুঙ সম্প্রদায়ের হাতে দুই হাজারের বেশি বাঙালি প্রাণ হারান হিন্দু ও মুসলিম উভয়েই এই গণহত্যার স্বীকার হয় দোষ ছিল তারা বাঙ্গালী৷ এক আইনে বলা হয়, যারা ১৯৬৬ থেকে ১৯৭১ সালের মধ্যে আসামে ঢুকেছে তারা দশ বছরের জন্য ভোটাধিকার হারাবে৷ যারা ২৪ মার্চ ১৯৭১ সালের মধ্যে আসামে ঢোকার প্রমাণ দিতে পারবেন না, তাদের তাড়িয়ে দেওয়া হবে৷

১৯৮৫ সালে আসাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়৷ এর আওতায় ১৯৬৬ সালের ১ জানুয়ারির পর যারা ভারতে গেছেন তাদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়৷

২০০৩ সালে নাগরিকত্ব (সংশোধিত) আইন অনুযায়ী, ১৯৫০ থেকে ১৯৮৭ সালের মধ্যে জন্ম নেয়া যে কেউ এবং ১৯৮৭ থেকে ২০০৩ সালের মধ্যে অন্তত একজন ভারতীয় বাবা-মার ঘরে জন্ম নেয়া শিশু ভারতের নাগরিক বলে গণ্য হবে৷২০১৩ সালে সুপ্রিম কোর্ট আসামের রাজ্য কর্তৃপক্ষকে নাগরিকপঞ্জি হালনাগাদ করার নির্দেশ দেন৷২০১৫ সালে সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণে রাজ্য কর্তৃপক্ষ গণনা ও নাগরিকদের ভেরিফাই করা শুরু করে৷২০১৬ সালে পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে আসা অমুসলিমদের নাগরিকত্ব দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বিজেপি৷২০১৭ সালে
আসামের নতুন নাগরিকপঞ্জির প্রথম খসড়া প্রকাশ করা হয়৷

এতে আবেদন করা তিন কোটি ২৯ লাখ মানুষের মধ্যে এক কোটি ৯০ লাখের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়৷ ২০১৮ সালে দ্বিতীয় খসড়ায় দুই কোটি ৮৯ লাখের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়৷ বাদ পড়েন প্রায় ৪০ লাখ জন৷২০১৯ সালে চূড়ান্ত নাগরিকপঞ্জি প্রকাশ করা হয় এতে ১৯ লাখ ৬ হাজার ৬৫৭ জন মানুষ বাদ পরেন।

সূত্র- ডয়চে ভেলেকে