জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সৌরবিদ্যুতে জোর

দেশে চলমান জ্বালানি সংকট, গ্যাসের ঘাটতি এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ক্রমবর্ধমান ব্যয় মোকাবিলায় বিকেন্দ্রীভূত নবায়নযোগ্য জ্বালানির (ডিস্ট্রিবিউটেড রিনিউয়েবল এনার্জি) দ্রুত সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, গবেষক ও খাতসংশ্লিষ্টরা।

তাদের মতে, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ (রুফটপ সোলার), সোলার হোম সিস্টেম, কৃষিতে সৌরবিদ্যুৎ এবং ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থার বিস্তার ঘটাতে হলে নীতিগত সংস্কার, একক অনুমোদন ব্যবস্থা, কর-শুল্ক ছাড়, সহজ অর্থায়ন এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ একসঙ্গে নিতে হবে। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারকে সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করারও আহ্বান জানান তারা।

রোববার (২ আগস্ট) দুপুরে রাজধানীর পল্টনে ইকনোমিক রিপোটার্স ফোরামে (ইআরএফ) ‘বিকেন্দ্রায়িত নবায়নযোগ্য জ্বালানি: বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সৌরবিদ্যুৎ সমাধান’ শীর্ষক সেমিনারে এসব কথা বলেন বক্তারা। ইআরএফ এবং ডিস্ট্রিবিউটেড রিনিউয়েবল এনার্জি প্ল্যাটফর্মের (ডিআরইপি) যৌথভাবে এই সেমিনারের আয়োজন করে।

সিপিডির রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট মো. মেহেদী হাসান শামীম বলেন, আমরা ২০২৫ সালের একটা জরিপ করেছিলাম, সেখানে দেখেছি ৪৫ শতাংশ সোলার নন ফাংশন হয়ে আছে। রুফটপ সোলার ফাংশন করতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নেট মিটারিংয়ের আবেদন করার ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর জোর দেন তিনি।

বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউঅ্যাবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসআরইএ) কোম্পানি সেক্রেটারি এ এস এম মুনির বলেন, সৌরবিদ্যুৎ প্ল্যাটফর্মের জন্য অনেক ইকোসিস্টেম জড়িত। আমদানিকারক, প্রস্তুতকারক, বিরতণসহ নানান বিষয় জড়িত। আমরা চাই প্রজেক্ট বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন জায়গা থেকে অনুমোদন না নিয়ে যে কোনো একটি জায়গা থেকে অনুমোদন নিতে হবে।

তিনি বলেন, ডিস্ট্রিবিউশন পর্যায়ে সোলার প্যানেল-ইনভার্টারসহ যেগুলো ব্যবহার করা হয় সেগুলো ট্যাক্স মওকুফ পায়নি।

এ এস এম মুনির বলেন, সৌরবিদ্যুৎ সেক্টরে প্রাইমারি একটা ফাইন্যান্সের প্রয়োজন হয়। স্থানীয় পর্যায়ে যারা ৫-১০ লাখ টাকার প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করতে চায়, তারা স্থানীয় কমার্শিয়াল ব্যাংক থেকে কোনো সহায়তা পায় না। বাজেটে যে ইনটেনসিভ বা কাস্টমস সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেগুলো যেন এই সেক্টরের সবাই পায়।
কোস্টাল লাইভলিহুড অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল অ্যাকশন নেটওয়ার্কের (ক্লিন) চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার হাসান মেহেদী বলেন, আমাদের সংকট একদিনের না, আমরা দীর্ঘদিন ধরে এটা তৈরি করেছি। বিষয়টা এমন হয়েছে যে অনেকগুলো গাড়ি কিনে ফেলেছি, কিন্তু তেল নেই। এর সমাধান আমাদের গ্রামের মানুষ করতে পারবে। দেশে যতগুলো পরিবার আছে তার মধ্যে ১০ শতাংশ পরিবার যদি এক কিলোওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করে তাহলেই অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

তিনি বলেন, রুফটপ সোলারের ক্ষেত্রে একটা ভালো বিজ্ঞাপন তৈরি করতে হবে। যেমন নব্বইয়ের দশকে একটা বিজ্ঞাপন তৈরি হয়েছিল- ‘রাত ১২টা বাজে, এখন পাম্প চালাও সেচ দাও’। এ ধরনের বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে রুফটপ সোলারকে জনপ্রিয় করতে হবে।

অ্যাকশন-এইড বাংলাদেশের জাস্ট এনার্জি ট্রানজিশন ম্যানেজার আবুল আজাদ বলেন, আমাদের চ্যালেঞ্জ হলো নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণের জন্য যে ইকোসিস্টেম প্রয়োজন, সেটি পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। সারাদেশে আমাদের প্রায় ৬৫ লাখ সোলার হোম সিস্টেম আছে। এখন সবমিলিয়ে হয়তো ২০ শতাংশ সোলার চালু আছে। যদিও সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে। সরকার এই ছয় মাসে বেশকিছু ভালো উদ্যোগ নিয়েছে। একটি ফাইন্যান্স গেটওয়ে বা মডেল তৈরি করা দরকার যেন এই খাতে বিনিয়োগে কোনো সমস্যা না হয়।

সেমিনারে দেশের জ্বালানি সংকট এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ক্রমবর্ধমান ব্যয় মোকাবিলায় বিকেন্দ্রীভূত নবায়নযোগ্য জ্বালানির (ডিস্ট্রিবিউটেড রিনিউয়েবল এনার্জি) সম্প্রসারণের ওপর জোর দেন ডিস্ট্রিবিউটেড রিনিউয়েবল এনার্জি প্ল্যাটফর্মের (ডিআরইপি) সমন্বয়ক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা প্রফেসর রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে প্রথমে দরকার সামাজিক আন্দোলন। আমরা সবাই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ যে বাসযোগ্য পৃথিবী আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে যেতে চাই। প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ-প্রতিবেশ জীববৈচিত্র রক্ষা করতে হবে, এজন্য সামাজিক আন্দোলন প্রয়োজন।

তিনি বলেন, সমাজের ভেতর থেকে যদি চাহিদা না আসে তাহলে মানুষ গ্রহণ করবে না। এজন্য সিভিল সোসাইটি এবং এনজিও- সবার উচিত এই চিন্তা করা যে পৃথিবীকে আমরা কীভাবে বাসযোগ্য করবো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার ঘটাবো।

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, দারিদ্র্য আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে যেভাবে পেয়েছি, তেমনিভাবে খাতা-কলমে নবায়নযোগ্য জ্বালানির কথা শুনেছি। এই যে গ্যাস সংকট, সমাধানের সহজ উপায় হতো যদি রান্না ঘরে সোলার সিস্টেম ডেভেলপ করা যেতো।

তিনি বলেন, সরকার স্থানীয় উৎপাদনের ওপর জোর দিচ্ছে, এতে আমাদের অগ্রগতি বেশী হবে। সরকার এনার্জি মিক্স করতে চায়। খুঁজে বের করতে হবে কোন কোন জায়গায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করতে পারলে আমাদের এনার্জি ইমপোর্ট কম করা লাগবে। এজন্য সরকার এই খাতের কর কাঠামোতে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে যা যা করা দরকার সরকার করবে।

সম্পর্কিত খবর