করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও গতি ফিরছে না যশোরের বাণিজ্যে
দেশের সর্ববৃহৎ স্থলবন্দর বেনাপোল ও নওয়াপাড়া নৌবন্দর ঘিরে বছরজুড়েই তৎপর থাকে বাণিজ্যিক কার্যক্রম। মোংলা সমুদ্রবন্দর ও ভোমরা স্থলবন্দরের বাণিজ্যিক প্রভাবও পড়ে জেলার অর্থনীতিতে। এখানকার অর্থনীতির বড় বাজার মোটরপার্টস। এসব যন্ত্রাংশের জন্য দেশের বিভিন্ন জেলার ক্রেতাদের আনাগোনা থাকে সারা বছর। ব্যস্ত সময় পার করে জেলার বিসিক নগরীও। করোনার কারণে যার সবকিছুই থমকে গিয়েছিল। তবে করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও যশোরের অর্থনীতির সেই গতি এখনো ফেরেনি। সবকিছু পুরোদমে চালু থাকলেও কয়েক মাস ধরেই বাণিজ্যিক কার্যক্রম স্তিমিত হয়ে রয়েছে। ফলে খরচ মিটিয়ে লাভের পরিবর্তে লোকসান গুনতে হচ্ছে বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানকে।
যশোরের ব্যবসায়ীরা বলছেন, নভেল করোনাভাইরাসে স্থবির হয়ে পড়া অর্থনীতির চাকা এখনো সচল হয়নি। সব ব্যবসায় চলছে মন্দা ভাব। তেমন ক্রয়াদেশ পাচ্ছে না কলকারখানাগুলো। ক্রেতা সমাগম কমেছে মোটরপার্টস ও কাপড়ের দোকানগুলোতে। এর ওপর প্রণোদনা ঋণের টাকা পরিশোধ এখন তাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। এজন্য প্রণোদনার ঋণ পরিশোধে আরো সময় দেয়ার দাবি তাদের।
যশোর শহরের পাশেই ঝুমঝুমপুরে ৫০ একর জমির ওপর ১৯৬২ সালে গড়ে ওঠে বিসিক শিল্পনগরী। শিল্পনগরীতে মোট ১১৮টি ইউনিট রয়েছে। যার মধ্যে ১১৫টি ইউনিটেই শিল্প-কলকারখানা চালু রয়েছে। এসব শিল্প-কারখানায় প্রায় ছয় হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে। করোনার আগে এখানকার প্রতিষ্ঠানগুলোয় পুরোদমেই উৎপাদন কার্যক্রম চালু থাকত। ব্যস্ত সময় পার করতেন শ্রমিকরাও। তবে সেই গতি এখন অনেকটাই থমকে গেছে।
বিসিকে অবস্থিত গাড়ির যন্ত্রাংশ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এনায়েত ইঞ্জিনিয়ারিং কারখানার স্বত্বাধিকারী আকতার হোসেন বলেন, গত দুই বছর ধরে তেমন কোনো ক্রেতা নেই। অর্ডার না থাকায় যন্ত্রাংশ উৎপাদন করা হচ্ছে খুব সীমিত। এতে কারখানার বিদ্যুৎ বিল ও কর্মচারীদের বেতন হচ্ছে না।
একই কথা জানান যশোর বিসিকের প্রতিষ্ঠান এমইউসিইএ ফুডসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শ্যামল দাসও। ১৯টি দেশে হিমায়িত চিংড়ি রফতানি করে তার প্রতিষ্ঠান। তিনি বলেন, করোনার কারণে সব ধরনের বাণিজ্য বন্ধ হয়ে পড়েছিল। গত ফেরুয়ারি থেকে পাঁচটি দেশে রফতানি করছি। ব্যবসা সচল হতে কমপক্ষে আরো এক বছর লাগবে। এজন্য সরকারের প্রণোদনা ঋণের সময়সীমা বাড়ালে আমাদের জন্য খুব ভালো হতো।
যশোরের অর্থনীতির বড় বাজার হলো মোটরপার্টস ও মোটরসাইকেল পার্টস। শুধু বেনাপোল কাস্টমস এ খাত থেকে বছরে হাজার কোটি টাকার রাজস্ব পেয়ে থাকে। ছোট-বড় গাড়ির ইঞ্জিনসহ অন্যান্য যন্ত্রাংশ আমদানি করে সারা দেশে সরবরাহ করেন এখানকার ব্যবসায়ীরা। যে কারণে সারা বছর দেশের বিভিন্ন জেলার ক্রেতাদের আনাগোনা থাকত জেলাটিতে, যা এখন অনেকটাই কমে গেছে।
যশোর মোটরপার্টস ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি শাহিনুর হোসেন ঠান্ডু জানান, দেশের মধ্যে মোটরপার্টস ও মোটরসাইকেল পার্টসের বড় বাজার যশোর। এখানে দেশের বিভিন্ন জেলার গাড়ির মালিকরা আসেন ইঞ্জিন ও খুচরা যন্ত্রাংশ কিনতে। বছরে এখানে কমপক্ষে ৩ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়। তবে করোনার কারণে এখন ব্যবসার সেই অবস্থা নেই। দোকানিরা ব্যাংকঋণ নিয়ে চিন্তিত। অবস্থা এমন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে যে নিজেরাই চলতে পারছি না। যে কারণে আরো এক বছর প্রণোদনা ঋণ পরিশোধে সময় পেলে সবাই উপকৃত হতেন।
জেলার অর্থনীতি ভালোভাবে সচল হতে কমপক্ষে আরো দুই বছর সময় লেগে যেতে পারে বলে মনে করেন যশোর চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি মিজানুর রহমান খান। তিনি বলেন, সরকার করোনাকালে ব্যাংকঋণের সুদ মওকুফের কথা বললেও ব্যাংকগুলো তা করেনি। তারা এখন সেই টাকা বুঝে নিচ্ছে। ব্যবসায়ীরা খেলাপি হওয়ার ভয়ে ধার-দেনা করে ব্যাংক কিস্তি পরিশোধ করছেন। এজন্য সরকারকে আরো সহযোগিতার হাত বাড়াতে হবে।



