অপরাধী উদ্যোক্তা চেয়ারম্যান এবার পরিচালক পদও হারাচ্ছেন

সাবেক চেয়ারম্যান এসএম আমজাদ হোসেন ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে ২৬৩ কোটি টাকার ঋণ রয়েছে সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স (এসবিএসি) ব্যাংকের। ব্যাংকিং রীতিনীতি উপেক্ষা করে নেয়া এ ঋণ এখন খেলাপি হওয়ার পথে। এ অবস্থায় আমজাদ হোসেনকে খুঁজে না পেয়ে তার মালিকানাধীন শেয়ার ব্যাংকের অনুকূলে স্থানান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে এসবিএসি ব্যাংক পর্ষদ। একই সঙ্গে স্ত্রী বেগম সুফিয়া আমজাদসহ আমজাদ হোসেনের স্বার্থসংশ্লিষ্ট অন্য প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা শেয়ারও ব্যাংকের অনুকূলে স্থানান্তরের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সেক্ষেত্রে তিনি বা তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট কারো ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদে থাকা আর সম্ভব হচ্ছে না। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি চেয়ে চিঠিও দিয়েছে ব্যাংকটি।

সেপ্টেম্বরে ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদ ছাড়ার পর পরই গা-ঢাকা দিয়েছিলেন এসএম আমজাদ হোসেন। ওই সময়ের পর থেকে এখন পর্যন্ত তার কোনো হদিস পায়নি ব্যাংক। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রথমে দেশে লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকলেও পরবর্তী সময়ে তিনি পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে।

সাউথ বাংলা ব্যাংকে আমজাদ হোসেন, তার স্ত্রী সুফিয়া আমজাদ এবং তাদের মালিকানাধীন সাউদার্ন ফুড ও মুনস্টারের শেয়ার রয়েছে ৮ কোটি ২০ লাখ। চলতি বছরেই পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় ব্যাংকটি। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার সাপ্তাহিক লেনদেনের শেষ দিনে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) ব্যাংকটির প্রতিটি শেয়ারের বাজারদর ছিল ১৮ টাকা ১০ পয়সা। সে হিসেবে আমজাদ হোসেন ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট সব শেয়ার বিক্রি করলে ১৪৮ কোটি টাকা আদায় করতে পারবে ব্যাংকটি। বাকি টাকা আদায়ের জন্য আইনি পথে হাঁটার পরিকল্পনা করছে এসবিএসি ব্যাংক পর্ষদ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে এসবিএসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদ বলেন, পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক অনুমোদন দিলে আমজাদ হোসেন এবং তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা শেয়ার বিক্রি করে ব্যাংকের টাকা সমন্বয় করা হবে।

এদিকে আমজাদ হোসেনের মালিকানাধীন লকপুর গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ দিয়ে বিপদে পড়েছে সরকারি-বেসরকারি আরো অন্তত পাঁচটি ব্যাংক। ব্যাংকগুলো হলো রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ও জনতা ব্যাংক এবং বেসরকারি খাতের ইসলামী ব্যাংক, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক ও আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক। লকপুর গ্রুপের বিভিন্ন কোম্পানির নামে এসব ব্যাংকের পাওনা ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। গ্রুপটির সব ঋণই বিভিন্ন সময়ে খেলাপি হওয়ায় পুনঃতফসিল হয়েছে। এর পরও আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে সব ঋণ খেলাপির খাতায় ওঠার ঝুঁকিতে পড়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গিয়েছে, বর্তমানে খুলনা ও বাগেরহাটভিত্তিক লকপুর গ্রুপের প্রায় সব প্রতিষ্ঠানেরই উৎপাদন বন্ধ। মূলত চিংড়িসহ হিমায়িত খাদ্য রফতানির ব্যবসা রয়েছে লকপুর গ্রুপের। কাগজে-কলমে এর বাইরে সিরামিক, প্রিন্টিং, প্যাকেজিং, আবাসন, হোটেল ও পাটের ব্যবসাও রয়েছে গ্রুপটির। দুই ডজনের বেশি কোম্পানি খুলে বসলেও আমজাদ হোসেনের মালিকানাধীন বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানই কাগুজে। আমজাদ হোসেনের মালিকানাধীন খুলনা প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং লিমিটেড দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত। বর্তমানে এ কোম্পানির উৎপাদনও বন্ধ রয়েছে।

হিমায়িত খাদ্য রফতানির জন্য বন্ডেড সুবিধায় কাগজ ও অন্যান্য পণ্য আমদানি করে তা খোলাবাজারে বিক্রির অভিযোগও রয়েছে আমজাদ হোসেনের বিরুদ্ধে। ২৫০ কোটি টাকা শুল্ক ফাঁকির অভিযোগে এরই মধ্যে তার মালিকানাধীন ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট চারটি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করেছে মোংলা কাস্টম হাউজ। ঋণ জালিয়াতিসহ নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে গত বছর তার বিদেশযাত্রার ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সর্বশেষ গত ২১ অক্টোবর কাগুজে প্রতিষ্ঠানের নামে জালিয়াতির মাধ্যমে সাউথ বাংলা ব্যাংক থেকে ২০ কোটি ৬০ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে আত্মসাতের অভিযোগে দুদক আমজাদ হোসেনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নিয়ে ব্যাংকটির আরো ১৮ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনায় দুদক আরেকটি মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চূড়ান্ত করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে।

লকপুর গ্রুপের প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পলি প্রিন্টিং ইন্ডাস্ট্রিজ, ইস্টার্ন পলিমার, মুনস্টার পলিমারসহ বিভিন্ন কোম্পানির নামে ৩৭০ কোটি টাকার বেশি ঋণ রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের। ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আব্দুছ ছালাম আজাদ বলেন, লকপুর গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থা অনেক আগে থেকেই খারাপ। বর্তমানেও প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ বলেই শুনেছি। বিভিন্ন সময়ে পুনঃতফসিল করা হলেও ঋণ পরিশোধে গ্রুপটির কর্ণধারদের আন্তরিকতা প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে কিস্তি পরিশোধ না করলে লকপুরের সব ঋণই খেলাপির খাতায় উঠবে।

চীনাদের সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগে আমজাদ হোসেন সাউথইস্ট ইউনিয়ন সিরামিক নামের একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। প্রতিষ্ঠানটিতে শতকোটি টাকার বিনিয়োগ রয়েছে সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডের। ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী ওসমান আলী বলেন, সিরামিক প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। আমজাদ হোসেনের কাছ থেকে টাকা আদায়ে আমরা অনেক আগেই উদ্যোগ নিয়েছি। কারখানাটি আমাদের ব্যাংকে জামানত দেয়া আছে। উদ্যোক্তারা অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে আমরা জামানত বিক্রি করে অর্থ আদায়ে উদ্যোগী হব।

২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে টানা নয় বছর এসবিএসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদ আঁকড়ে রেখেছিলেন এসএম আমজাদ হোসেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘ এ সময়ে চেয়ারম্যান ব্যাংকটিকে ব্যক্তিগত সম্পত্তির মতোই ব্যবহার করেছেন। রীতিনীতির তোয়াক্কা না করেই ব্যাংকের শত শত কোটি টাকার ঋণ ব্যবহার করেছেন নিজের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে। নিজের ভাতিজি, প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীর নামেও কোম্পানি খুলে ব্যাংক থেকে টাকা বের করেছেন তিনি। চেয়ারম্যান পদ ছাড়ার পরও তার কাছে ব্যাংকের পাওনা থেকে গিয়েছে ২৬৩ কোটি টাকা।

এর মধ্যে আলফা অ্যাকসেসরিজ অ্যান্ড এগ্রো এক্সপোর্টের মালিকানা আমজাদ হোসেনের ভাইয়ের মেয়ে ও কর্মচারীদের নামে। বর্তমানে আলফা অ্যাকসেসরিজ অ্যান্ড এগ্রো এক্সপোর্টের কাছে এসবিএসি ব্যাংকের পাওনা দাঁড়িয়েছে ১৬৫ কোটি টাকা। এছাড়া আমজাদ হোসেনের স্বার্থসংশ্লিষ্ট অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সাউদার্ন ফুডসের কাছে ২৫ কোটি, খুলনা বিল্ডার্সে ২২ কোটি, রাহিমাহি আলামিনের নামে ২০ কোটি, রূপসা ফিশ অ্যান্ড অ্যালাইডের নামে ৫ কোটি, ইস্টার্ন পলিমারের নামে ৪ কোটি ও মুনস্টারের নামে ৪ কোটি টাকার ঋণ রয়েছে। কোনো নথিপত্র ও পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন ছাড়াও এসবিএসি ব্যাংক থেকে ১৮ কোটি টাকার ঋণ বের করে নিয়েছেন আমজাদ হোসেন।

প্রসঙ্গত, গত ১৯ সেপ্টেম্বর ‘সাউথ বাংলা ব্যাংকের চেয়ারম্যান এসএম আমজাদ হোসেন, অনিয়মের ধারাপাত’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। প্রতিবেদনটি প্রকাশ হওয়ার পর চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংকটিকে বাঁচাতে বাংলাদেশ ব্যাংক, দুদকসহ সংশ্লিষ্টরা তত্পর হয়ে ওঠে। সংগঠিত হয়ে ব্যাংকটির পরিচালকরাও চেয়ারম্যানের পদত্যাগ দাবি করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে পরদিনই ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদ থেকে আমজাদ হোসেন পদত্যাগ করেন। পরে ২৬ সেপ্টেম্বর ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদে চেয়ারম্যানের পদত্যাগপত্র গৃহীত হয়। ওই দিনই থার্মেক্স গ্রুপের কর্ণধার আবদুল কাদির মোল্লা এসবিএসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।

 

সম্পর্কিত খবর