লুটপাটে ধ্বংস প্রগ্রেসিভ লাইফ, সম্পদ বিক্রি নিয়ে প্রশ্ন
জিনান মাহমুদ:
গ্রাহকদের কোটি কোটি টাকার পাওনা পরিশোধে ব্যর্থতার পাশাপাশি চরম অনিয়ম, দুর্নীতি, লুটপাট ও পরিচালনা পর্ষদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে ধ্বংসের মুখে পড়েছে প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্স। চেয়ারম্যানের পদ আঁকড়ে থাকা, শীর্ষ নির্বাহীদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড এবং সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের কোনো অনুমোদন ছাড়াই কোম্পানির স্থাবর সম্পত্তি (জমি, ফ্লোর ও ভবন) বিক্রির পাঁয়তারা চলছে। সব মিলিয়ে গভীর সংকটে থাকা এই প্রতিষ্ঠানে সাধারণ গ্রাহক ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির স্থবিরতা, আর্থিক দুর্নীতি ও সম্পদ বিক্রির প্রক্রিয়া বন্ধের দাবিতে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত আবেদন জমা দিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির স্পন্সর শেয়ারহোল্ডার ও পরিচালকরা। একই সঙ্গে বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ’র চেয়ারম্যানের কাছেও এই অভিযোগের অনুলিপি পাঠানো হয়েছে। সম্প্রতি পাঠানো এই আবেদনে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর নানা তথ্য ও গুরুতর অনিয়মের চিত্র। আবেদনে স্বাক্ষর করেছেন কোম্পানির স্পন্সর পরিচালক—নাসির আলী শাহ, চৌধুরী ফারকান্দাহ শাহ, আব্দুল মালিক, কামাল মিয়া এবং এম. এ. করিম।
সুশাসনের অভাবে ধুঁকছে প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্স। আইন ভঙ্গ করে পর্ষদ পুনর্গঠন ও বিতর্কিত ব্যক্তিদের স্বাধীন পরিচালক পদে বসিয়ে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ করায় অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব আরও তীব্র হয়েছে। স্পন্সর পরিচালকদের অভিযোগ, বর্তমান চেয়ারম্যান বজলুর রশীদ নিজের পদ টিকিয়ে রাখতে ২০২৪ ও ২০২৫ সালের বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) করছেন না। এছাড়া তাঁর ঢাকা-লন্ডন যাতায়াতের বিমান টিকিট ও ভ্রমণ খরচ এবং প্রতিদিনের বিপুল আপ্যায়ন ব্যয় কোম্পানির তহবিল থেকে নেওয়া হচ্ছে। লিগ্যাল ও উন্নয়ন খাতের নামে অতিরিক্ত ব্যয়, বিশেষ করে আইনি খরচের জন্য ২০ লাখ টাকা তোলার বিষয়টি কোম্পানির স্বার্থের পরিপন্থী ও সন্দেহজনক বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্সের চেয়ারম্যান বজলুর রশীদ বর্তমানে বিদেশে অবস্থান করায় তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
গ্রাহকদের বীমা দাবি পরিশোধে ব্যর্থ প্রগ্রেসিভ লাইফ। লুটপাট ও অর্থ সংকটে দুই দশকেরও বেশি সময়ে চলা প্রতিষ্ঠানটি এখন গভীর খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে আছে। ২০০৭ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত যেখানে কোম্পানির মোট প্রিমিয়াম আয় ছিল ৭০১.৮৮ কোটি টাকা, সেখানে ২০১৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত তা কমে অত্যন্ত শোচনীয় অবস্থায় নেমে এসেছে। এছাড়া, ২০১৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত কোম্পানি প্রায় ২২৯.১৯ কোটি টাকা ঋণাত্মক পরিচালন নগদ প্রবাহের মুখোমুখি হয়েছে। মূলত কোম্পানির মূল ব্যবসা থেকে পর্যাপ্ত কোনো নগদ অর্থ আসছে না, যা প্রতিষ্ঠানের কাঠামোগত দুর্বলতা এবং চরম অব্যবস্থাপনার স্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ। একের পর এক আইন লঙ্ঘন করে মাত্রাতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা ব্যয় এবং বিনিয়োগের তহবিল যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করার ফলে পলিসিহোল্ডারদের টাকা চরম ঝুঁকিতে পড়েছে। ফলে গ্রাহকদের বীমা দাবি সময়মতো পরিশোধ করতে পারছেনা। হুদা ভাসী চৌধুরী অ্যান্ড কোং-এর ম্যানেজমেন্ট অডিট রিপোর্টের পর্যবেক্ষণেও প্রগ্রেসিভের ভয়াবহ চিত্র উঠে আসে।
বিতর্কিত কর্মকান্ড ও নানা সমস্যায় জর্জরিত এই জীবন বীমা প্রতিষ্ঠান। ২০১৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত কোম্পানির মোট বিনিয়োগ আয় প্রায় ২৫৩.৫৬ কোটি টাকা হলেও, এর একটি বড় অংশ বীমা আইনের ৬২ ধারা লঙ্ঘন করে অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা ব্যয়ে ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
আইন অনুযায়ী নিয়মিত এজিএম করার কথা থাকলেও বিগত বছরগুলোতে চরম অনিয়ম করা হয়েছে। ২০১৩ থেকে ২০১৫ সালের এজিএম করা হয়েছে ২০১৯ সালে, আর ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের এজিএম হতে লেগেছে ২০২৫ সাল। এমনকি আইনগত বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও ২০২৪ ও ২০২৫ সালের এজিএম এখনও করা হয়নি।
প্রগ্রেসিভে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব তীব্র আকার ধারণ করেছে। পরিচালকদের অভিযোগ, বর্তমান চেয়ারম্যানের প্রশ্নবিদ্ধ কর্মকান্ডে প্রাতিষ্ঠানিক স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় প্রগ্রেসিভ লাইফ রাজধানীর কাকরাইল, বিজয়নগর, আফতাবনগর এবং মৌলভীবাজারে জমি, ফ্লোর স্পেস ও ভবনসহ স্থাবর সম্পত্তি বিক্রির জন্য দরপত্র আহ্বান করেছে। শেয়ারহোল্ডার ও স্পন্সর পরিচালকদের দাবি, এ ধরনের সংবেদনশীল সিদ্ধান্ত আর্টিকেল অব অ্যাসোসিয়েশন ও পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার আইন লঙ্ঘন করে নেওয়া হচ্ছে। জমি, ফ্লোর স্পেস ও বিল্ডিং বিক্রির গোপন ও তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত তীব্র উদ্বেগ ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। কোনো ধরনের আইনানুগ অনুমোদন বা মতামত ছাড়াই সম্পদ বিক্রির আত্মঘাতী সিদ্ধান্তে কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়বে। বর্তমানে কোম্পানির সম্পদ থেকে আর্থিক দায় আশঙ্কাজনকভাবে বেশি এবং ক্যাশ ফ্লো সম্পূর্ণ নেতিবাচক। দুর্নীতি রোধ, গ্রাহকদের আমানত রক্ষা ও কোম্পানির স্থবিরতা দূর করতে বিএসইসি ও আইডিআরএ’র যৌথ উদ্যোগে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন এবং সম্পদ বিক্রির প্রক্রিয়া বন্ধের জোরালো দাবি জানিয়েছেন স্পন্সর শেয়ারহোল্ডার ও পরিচালকরা। এ বিষয় তারা আইডিআরএর হস্তক্ষেপ চেয়েছেন।
তবে গ্রাহকদের দীর্ঘদিনের জমে থাকা বীমা দাবি ও পাওনা অর্থ পরিশোধের জন্য কোম্পানির স্থাবর সম্পদ বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে প্রোগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্স। কোম্পানির অভ্যন্তরীণ সূত্র জানিয়েছে, গত কয়েক বছর ধরে কোম্পানির ব্যবসায়িক কার্যক্রমে স্থবিরতা, পরিচালন নগদ প্রবাহে নেতিবাচক ধারা এবং ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত নানা সংকটের কারণে পলিসিহোল্ডারদের বৈধ দাবি সময়মতো পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছিল না। এই আর্থিক চাপ ও সংকট মোকাবেলার অংশ হিসেবেই কোম্পানিটির জমি, ফ্লোর স্পেস এবং ভবনসহ নির্দিষ্ট কিছু সম্পদ বিক্রির প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে।
গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধ ও সম্পদের সঠিক মূল্যায়নের দাবি জানিয়ে এ প্রসঙ্গে কোম্পানির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সিইও মো. জহির উদ্দিন অর্থবাংলা-কে বলেন, বর্তমানে কোম্পানিতে অনাদায়ী বীমা দাবির পরিমাণ প্রায় ১৫৯ কোটি ২৩ লাখ টাকা। উদ্বেগের বিষয় হলো, গ্রাহকদের এই বকেয়া পাওনা কোম্পানির মোট জীবন বীমা তহবিলের (লাইফ ফান্ড) প্রায় আড়াই গুণ। দীর্ঘ দিন ধরে বীমা দাবি নিষ্পত্তিতে ব্যর্থ হওয়ায় গ্রাহকদের মধ্যে চরম ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। ২০১০ সালের বীমা আইনের ৬২ ধারা লঙ্ঘন করে বছরের পর বছর ধরে অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা ব্যয় মেটানো এবং বিনিয়োগ আয়ের অপব্যবহারের ফলে তীব্র তারল্য সংকটে পড়েছে। ২০১৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত কোম্পানির মূল ব্যবসা থেকে পর্যাপ্ত আয় না হয়ে উল্টো প্রায় ২২৯ কোটি টাকার নগদ ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এছাড়া ২০০৯ থেকে ২০১২ সালের অডিট রিপোর্টেও প্রায় ১১৪ কোটি ২২ লাখ টাকা আর্থিক অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে, যা এখনো তদন্ত চলছে। কোম্পানি রক্ষায় এসব বিষয়ে বিএসইসি ও আইডিআরএ’র যৌথ পদক্ষেপ প্রয়োজন ।
বিএসইসিতে পরিচালকদের করা অভিযোগের বিষয়ে কোনো তথ্য নেই বলে মন্তব্য করেছেন প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্সের সিইও সাইদুল আমিন। একই সঙ্গে তিনি কোম্পানির চেয়ারম্যানের বিমান ভাড়া ও অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন। অর্থবাংলা-কে দেওয়া বক্তব্যে তিনি আরও জানান, আইডিআরএ’র নির্দেশনা অনুযায়ী গ্রাহকদের বীমা দাবির বকেয়া টাকা পরিশোধের জন্য কোম্পানির সম্পদ বিক্রির প্রক্রিয়া ও চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
অনিয়মে অভিযুক্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ বীমা কোম্পানিগুলোকে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের মুখপাত্র সাদিক আরমান। তিনি অর্থবাংলা-কে জানান, গ্রাহকদের বকেয়া টাকা পরিশোধের জন্য আইডিআরএ থেকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বীমা খাতের কোনো ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতি কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। এছাড়া সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হলে সেখানে আইন অনুযায়ী প্রশাসক বসানো হতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।



