শিরোনাম
বাংলাদেশকে ৩৯০ কোটি টাকা দিচ্ছে কানাডাআইডিআরএ’র নতুন সদস্য কামরুল আহসান ও সফিকুল ইসলামলুটপাটে ধ্বংস প্রগ্রেসিভ লাইফ, সম্পদ বিক্রি নিয়ে প্রশ্নমাতারবাড়ীতে শিল্প করিডোর চায় জাপানবৈরুতের মতো চট্টগ্রাম বন্দরে বিস্ফোরণের শঙ্কাব্যবসায় সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা ঋণ, আবেদন ১ নভেম্বর থেকেরিয়াদগামী সব ফ্লাইট অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিতসহজ শর্তে ঋণ বাড়াতে আইএমএফের তাগিদদাম কমায় ইউরোপে পোশাক রপ্তানিতে ধাক্কাসূচকের উত্থানে চলছে লেনদেনআজ খোলা থাকবে ব্যাংকডেঙ্গুতে ৪ মৃত্যু, ভর্তি ১,১৮১ জনমুন্নু সিরামিকসের বোর্ড সভা ২৮ অক্টোবরসোনালী আঁশের বোর্ড সভা ২৯ অক্টোবরনিটল ইন্স্যুরেন্সের বোর্ড সভা ২৫ অক্টোবর
down of head

বৈরুতের মতো চট্টগ্রাম বন্দরে বিস্ফোরণের শঙ্কা

দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দরে বছরের পর বছর ধরে অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে ৩২৩ টিইইউ বিপজ্জনক রাসায়নিক বোঝাই কনটেইনার। এর মধ্যে ৪৪টি কনটেইনার জরাজীর্ণ হয়ে পড়ায় এবং কোনো কোনোটি থেকে রাসায়নিক বেরিয়ে আসায় অগ্নিকাণ্ড, বিস্ফোরণ ও পরিবেশদূষণের আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

২০২০ সালে লেবাননের বৈরুত বন্দরে অনিরাপদভাবে বিপুল পরিমাণ অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট মজুত থাকায় ভয়াবহ বিস্ফোরণে তিন বাংলাদেশিসহ ২০০ জনের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন; এবার চট্টগ্রাম বন্দরেও একই ধরনের বড় দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন ইয়ার্ড ও জেটিতে পড়ে থাকা এসব কনটেইনারের কোনো কোনোটি ১৫ থেকে ২০ বছরের পুরোনো। অ্যাসিড, মিথানল, থিনারসহ বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক রয়েছে এগুলোতে। দীর্ঘদিন ধরে যথাযথ নিষ্পত্তি না হওয়ায় একদিকে কনটেইনারের কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ছে, অন্যদিকে রাসায়নিক ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। বন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও ঘনবসতিপূর্ণ কর্মপরিবেশে এমন পরিস্থিতি বড় ধরনের নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি করেছে।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার রাসেল আহমেদ বলেন, এগুলো আগুনের উচ্চ ঝুঁকিসম্পন্ন কেমিক্যাল। স্বাভাবিকভাবেই এসব পণ্য দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছিল।

বন্দর কর্তৃপক্ষের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর সাইফুল ইসলাম রনি বলেন, যেকোনো মুহূর্তে এগুলো বিস্ফোরিত হতে পারে, আগুনও ধরতে পারে। আগুন লাগলে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হবে। কারণ, এটি একটি বন্ডেড এলাকা। এখানে শুধু এসব পণ্যই নয়, আরও বিভিন্ন ধরনের পণ্য রয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দরে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ আমদানি-রপ্তানি পণ্য ওঠানামা করে। এখানে বিভিন্ন ধরনের পণ্য, যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামো পাশাপাশি থাকায় বিপজ্জনক রাসায়নিকের কোনো একটি কনটেইনারে আগুন লাগলে তা আশপাশে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে শুধু পণ্য ও অবকাঠামোর ক্ষতি নয়, ব্যাহত হতে পারে বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রমও। রাসায়নিকের ধরন অনুযায়ী বিষাক্ত বাষ্প ছড়িয়ে পড়া এবং আশপাশের মাটি ও পানি দূষিত হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।

বন্দর সূত্র জানায়, আমদানিকারকদের পণ্য খালাস না করা, নিলামপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে বছরের পর বছর পড়ে রয়েছে এসব রাসায়নিক। আমদানির ৩০ দিনের মধ্যে পণ্য খালাস না করায় নিলামে বিক্রির জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র কাস্টমস কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। তবে বিপজ্জনক রাসায়নিকের ক্ষেত্রে সাধারণ পণ্যের মতো নিলামপ্রক্রিয়া অনুসরণ করলেই সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। রাসায়নিকের ধরন, ব্যবহারযোগ্যতা, সংরক্ষণের অবস্থা ও পরিবেশগত ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করতে হচ্ছে।

এর মধ্যে বন্দরে পড়ে থাকা বিপজ্জনক রাসায়নিক অপসারণে সম্প্রতি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রথম ধাপে নয়টি কনটেইনার নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ওয়াটা কেমিক্যালস লিমিটেডের কারখানায় ধ্বংসের জন্য পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। এসব কনটেইনারে মোট ১৫০ দশমিক ৮৯ টন রাসায়নিক ছিল। এর মধ্যে ২৫ দশমিক ৫৫ টন সালফিউরিক অ্যাসিড, ৫০০ কেজি নাইট্রিক অ্যাসিড, ৯২ দশমিক ৫৪ টন মিথানল এবং ৩২ দশমিক ৩০ টন থিনার রয়েছে।

তবে রাসায়নিক পরিবহনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি কাভার্ড ভ্যানে আগুন লাগার ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কাঁচপুর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, গাড়িতে থাকা ড্রামগুলো খালি ছিল এবং প্রাথমিকভাবে গাড়ির ইঞ্জিন থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়েছিল। ফলে ঘটনাটিকে রাসায়নিকের বিস্ফোরণ হিসেবে বর্ণনা করার ভিত্তি নেই। তবে বিপজ্জনক পণ্য পরিবহনের সময় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করার গুরুত্ব আবারও সামনে এসেছে।

এদিকে পরীক্ষামূলকভাবে ওয়াটা কেমিক্যালস লিমিটেডের কারখানায় আটটি কনটেইনারের রাসায়নিক ধ্বংসের প্রক্রিয়া সফল হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। কিন্তু বন্দরে পড়ে থাকা বিপুল পরিমাণ রাসায়নিকের নিরাপদ নিষ্পত্তির জন্য আরও বড় পরিসরের সক্ষমতা ও উপযুক্ত স্থাপনা প্রয়োজন। ফলে অবশিষ্ট রাসায়নিকের ধরন ও পরিমাণ নির্ধারণ করে দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা জরুরি হয়ে উঠেছে।

জরাজীর্ণ কনটেইনারে থাকা বিপজ্জনক রাসায়নিক নিলামে বিক্রি না করে বন্দরে ফেলে রাখায় অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণের ঝুঁকি বাড়ছে– এমন উদ্বেগ জানিয়ে কাস্টম কমিশনারকে চিঠি দিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। এসব পণ্য দ্রুত সরিয়ে নেওয়া এবং ঝুঁকি কমানো এখন সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার শরীফ মোহাম্মদ আল আমিন বলেন, কাস্টমস ও বন্দর কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে এসব পণ্য নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিয়েছে। আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনা অনুযায়ী পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর) অনুসরণ করে নিলাম প্রক্রিয়ায় যাওয়া হবে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, ব্যবহারযোগ্য রাসায়নিকের ক্ষেত্রে আইনানুগভাবে নিলামে বিক্রির ব্যবস্থা করা যেতে পারে। অন্যদিকে মেয়াদোত্তীর্ণ, ব্যবহার অনুপযোগী বা অতিরিক্ত ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিকের ক্ষেত্রে উপযুক্ত স্থাপনায় নিরাপদে ধ্বংস করার প্রয়োজন হতে পারে। এ ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি পরিবেশ ও জননিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমন্বয়ক মনিরা পারভীন বলেন, বন্দরে দীর্ঘদিন ধরে বিপজ্জনক রাসায়নিক পড়ে থাকা এবং জরাজীর্ণ কনটেইনার থেকে রাসায়নিক বেরিয়ে আসার বিষয়টি পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক। এসব রাসায়নিকের কারণে মাটি, পানি ও বায়ুদূষণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই রাসায়নিকের ধরন ও ঝুঁকি নিরূপণ করে পরিবেশগত আইন ও বিধিবিধান অনুসরণ করে দ্রুত নিরাপদ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত কনটেইনারগুলো নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া, সম্ভাব্য দূষণ প্রতিরোধ এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত পদক্ষেপ জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের বিষয় হলো, বিপজ্জনক রাসায়নিকের ঝুঁকি শুধু আগুন বা বিস্ফোরণে সীমাবদ্ধ নয়। ক্ষতিগ্রস্ত কনটেইনার থেকে অ্যাসিড বা অন্য রাসায়নিক বেরিয়ে এলে আশপাশের মাটি ও পানি দূষিত হতে পারে। কিছু রাসায়নিকের বাষ্প মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। আবার দাহ্য রাসায়নিকের ক্ষেত্রে আগুনের সামান্য উৎস থেকেও বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। তাই ক্ষতিগ্রস্ত কনটেইনার শনাক্ত করা, রাসায়নিকের প্রকৃতি নির্ধারণ, নিরাপদ সংরক্ষণ এবং পরিবেশসম্মত উপায়ে ধ্বংস করার ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

চট্টগ্রাম বন্দর দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার। সেখানে বছরের পর বছর বিপজ্জনক রাসায়নিক পড়ে থাকা এবং জরাজীর্ণ কনটেইনার থেকে রাসায়নিক বেরিয়ে আসার বিষয়টি এখন আর শুধু পণ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যা নয় এটি বন্দর নিরাপত্তা, পরিবেশ সুরক্ষা ও জনস্বাস্থ্যের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, বন্দরে ৩০০ টিইইউর বেশি বিপজ্জনক পণ্য রয়েছে। এসব পণ্য বন্দরের ভেতর থেকে সরিয়ে নিতে নিয়মিত কাস্টমস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করছি এবং তাদের তথ্য দিচ্ছি।

বিস্ফোরক অধিদপ্তরের চট্টগ্রামের সাবেক সহকারী পরিদর্শক এস এম শাখাওয়াত হোসেন বলেন, বিপজ্জনক রাসায়নিক দীর্ঘদিন ধরে বন্দরে পড়ে থাকা এবং জরাজীর্ণ কনটেইনারে সংরক্ষিত থাকার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, রাসায়নিকের ধরন, সংরক্ষণব্যবস্থা ও বর্তমান অবস্থা যাচাই করে সম্ভাব্য ঝুঁকি নিরূপণ করা জরুরি। বিশেষ করে ক্ষতিগ্রস্ত কনটেইনার থেকে রাসায়নিক বেরিয়ে আসার ঘটনা থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে দ্রুত নিরাপদ সংরক্ষণ ও বিধি অনুযায়ী নিষ্পত্তির ব্যবস্থা নিতে হবে। এতে অগ্নিকাণ্ড, দুর্ঘটনা ও পরিবেশদূষণের ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে।

সম্পর্কিত খবর