একান্ত সাক্ষাতকারে মোহাম্মদ আবু বকর সিদ্দিক-
‘বীমায় ক্ষতিপূরণ পেতে গ্রাহকেরও স্বচ্ছতা দরকার’

আদম মালেক :

জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছে বীমা কোম্পানী। কাঙ্খিত সেবাদানের প্রতিশ্রুতি থাকলেও বীমা কোম্পানীর সেবা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে। প্রতিনিয়ত প্রশ্নবাণে বিদ্ধ কোম্পানীগুলো, কিন্তু এক্ষেত্রে
গ্রাহকের দায়দায়িত্বও কম নয়। বীমায় ক্ষতিপূরণ পেতে গ্রাহকেরও স্বচ্ছতা দরকার। একজন গ্রাহক যখন বীমা করেন
তখন তিনি চিন্তা করেন কত কম দামে বীমা করা যায়। গ্রাহক প্রিমিয়াম দিতে চাইবে সবচেয়ে কম। কমিশন চাইবে বেশী। ক্ষতিপূরণও চাইবে সর্বোচ্চ। বীমা গ্রাহক যদি কমিশন না নিতো, প্রিমিয়াম কম না দিতো, তাহলে আজকে
ক্ষতিপূরণও যথযথ পরিমাণে পেতো। এতে দাবি নিস্পত্তি নিয়ে আপত্তিকর কথা শোনা যেতো না। তাই গ্রাহক যদি
নিয়ম মেনে বীমা করেন তাহলে তাদের ক্ষতিপূরণ দিতে বীমা কোম্পানীগুলোর সুবিধা হতো বলে মন্তব্য করেছেন
মেঘনা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেডের মূখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবু বকর সিদ্দিক।

দেশের বীমা খাতের সার্বিক অবস্থা, সাধারণ বীমাখাতের প্রতিষ্ঠান মেঘনা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেডের ব্যবসায়ীক
কর্মকান্ডসহ নানা বিষয়ে অর্থনীতি বিষয়ক অনলাইন পত্রিকা অর্থবাংলাডটকম এর সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাতকার নিয়েছেন সিনিয়র রির্পোটার আদম মালেক।

মোহাম্মদ আবু বকর সিদ্দিক বলেন, বীমা খাত কে পুরোপুরি আস্থা এবং বিশ্বাসের জায়গায় নিয়ে আসতে হবে। দেশে বীমা কোম্পানীর সংখ্যা কম নয় কিন্তু সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন আছে। এখানে সেবা যারা দিবেন এবং যারা সেবা নিবেন
উভয়েরই পরিচ্ছন্ন মানসিকতা থাকতে হবে। যিনি সেবা নিবেন তিনি যদি প্রকৃত সেবার দিকে না তাকিয়ে অন্য
সুবিধার দিকে নজর দেন তাহলে তার ভবিষ্যত ভালো নয়। যেমন গ্রাহক নিজেও জানেন কমিশনের ওপর তার
কোনো অধিকার নেই। বীমা করার সময় কোম্পানীগুলো বীমার অধীনে যে ঝুঁকি বহনের অঙ্গীকার করে সে
ক্ষতিপূরণ পাওয়াই গ্রাহকের অধিকার। এক্ষেত্রে নানা প্রশ্ন আছে। যথা সময়ে যথা নিয়মে অনেক গ্রাহক ক্ষতিপূরণ পায় না। সেবা গ্রহীতা যদি বীমা করার সময় অনিয়মে না জড়ান অন্যদিকে না তাকান সেবাদাতার প্রকৃত সেবা দিতে
তেমন অসুবিধা হয় না। কিন্তু গ্রাহক বীমা কোম্পানীর কাছ থেকে সেবা নিতে গিয়ে প্রকৃত সেবার বিষয়টা হারিয়ে
ফেলে। বীমা কোম্পানীর বিরুদ্ধে যে নেতিবাচক দিক আলোচনা হয়, তাঁর পেছনে গ্রাহকেরও কিছু ভুমিকা রয়েছে। আসলে পরিচ্ছন্নতাবোধ সবার মাঝে থাকতে হবে।

বীমা খাত সঠিকভাবে পরিচালিত হতে স্বচ্ছতার বিকল্প নেই উল্লেখ করে এই বীমাবিদ বলেন, আমাদের ব্যবসা বিকাশের প্রধান অন্তরায় ছিলো অতিরিক্ত কমিশন। ইতিবাচক দিক হচ্ছে কমিশন এখন আর নেই। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ অতিরিক্ত কমিশন নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। এতে করে বীমা কোম্পানী এবং গ্রাহক উপকৃত হচ্ছে। কোম্পানীর প্রিমিয়াম বাড়লে ঝুঁকি গ্রহনণের ক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়। আসলে খাত সঠিকভাবে পরিচালিত হতে স্বচ্ছতার বিকল্প নেই। বীমাখাত শক্তিশালী হলে দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হবে, জিডিপিতে অবদান বাড়বে । বীমা খাতের উন্নয়নের মধ্যদিয়ে সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব। ডিজিটাল বাংলাদেশ আজ সমৃদ্ধ অর্থনীতির পথে এগিয়ে যাছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে আমাদের সবাইকে একসাথে এগিয়ে যেতে হবে। সাধারণ বীমা প্রতিষ্ঠান মেঘনা ইন্স্যুরেন্স বিকশিত অর্থনীতি এবং উন্নয়নের সহযাত্রী হতে চায়। সেজন্য মানুষের আস্থা অর্জন, ও প্রতিশ্রুতি রক্ষায় প্রতিক্ষণ কাজ করছে। আমরা যারা ভালো কাজ করছি তাদের মাধ্যমে বীমা খাত সফলতার শিখরে পৌছবে। সবাই মিলে আন্তরিক চেষ্টা করলে বীমা খাত অনেকদূর এগিয়ে যাবে। আর মাঠ পর্যায়ের এসকল বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে মেঘনা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী সবসময় বীমা সেবা দিয়ে আসছে। গ্রাহক স্বার্থ রক্ষাই প্রতিষ্ঠানটির প্রধান অঙ্গিকার।

বীমা খাতে কোভিডের প্রভাব নিয়ে পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে তিনি অর্থবাংলাডটকমকে বলেন, কোভিড নিয়ে আমরা যত শঙ্কিত ছিলাম। লকডাউনের সময় ব্যবসা প্রায় বন্ধ থাকলেও যখন এটি প্রত্যাহার করা হয়, তখন ব্যবসা অনেক বেড়ে গিয়েছিল। তবে যেসব কোম্পানির আমদানি-রফতানি ব্যবসার সঙ্গে বেশি সংশ্লিষ্ট ছিল, তাদের ক্ষেত্রে প্রভাব
পড়েছে। গত বছর কোভিডের প্রভাব সেভাবে টের না পেলেও এবার কিন্তু আমরা এটি কিছুটা অনুভব করছি।

মেঘনা ইন্স্যুরেন্স বীমা সেবার পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক কর্মকান্ড পরিচালনা করছে বলেও জানান এই মূখ্য নির্বাহী
কর্মকর্তা। বলেন, মানবতার কল্যাণে কাজ করছি আমরা। প্রতিষ্ঠানটি সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই গণমাধ্যম
হাসপাতাল, সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারিবাহিনীসহ বিভিন্ন করোনা থেকে সুরক্ষায় প্রচুর মাস্কসহ প্রচুর পিপিই দিয়েছে মেঘনা ইন্স্যুরেন্স। তাছাড়া হতদরিদ্রদের মাঝে চাল ডাল তেল লবনসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য সহায়তা দিয়েছে।

মোহাম্মাদ আবু বকর সিদ্দিক বলেন, সরকারের চেষ্টা আছে। আন্তরিকতা আছে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ
মুজিবুর রহমান এ পেশায় ছিলেন। তারই সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সহযোগিতা আমরা
পচ্ছি। জাতীয়ভাবে বীমা দিবস পালিত হচ্ছে। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ ইন্সুরেন্স এসোসিয়েশন, ইন্স্যুরেন্স ফোরাম কাজ করে যাচ্ছে। সবার চেষ্টার সুফল আমরা পেতে শুরু করেছি।

 

এই মূখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, আইডিআরএর উচিত এমডিদের চাকরির সুরক্ষা প্রদানের মাধ্যমে বিভিন্ন সুযোগ
সুবিধা বৃদ্ধি করে তাদের স্বাধীনতা দিতে হবে। চাকরি করতে গিয়ে যদি উন্নতি করতে না পারেন তাহলে চাকরির
নিরাপত্তা থাকে না। উন্নতি করতে হলে তার সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। এখানে যখন পেশাদারিত্ব তৈরী
হবে, প্রধান নির্বাহী যখন চিন্তা মুক্ত হবেন, ঠিক তখনি বীমাখাতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। ’২১ শতকের উপযোগী
বীমা খাত গড়ে তুলতে বিমা খাতের উন্নয়নে বিকল্প নেই। সবাই যদি সম্মিলিতভাবে কাজ করতে পারি তাহলে
সরককারের মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীতকরণ তৎপরতার সাথে নিজেদের সমন্বয় করতে পারি তাহলে এ খাত ঘুরে
দাঁড়াবে। রাষ্ট্রও সুফল পাবে।

অর্থবাংলাডটকমকে তিনি বলেন, বীমা খাতে সবচেয়ে বড় অভাব হলো দক্ষ জনশক্তির। এই সমস্যা থেকে বেড়িয়ে
আসতে আমাদের সবাইকে পরিকল্পিত সিদ্ধান্ত গ্রহন করতে হবে। বিশেষ করে দেশে অ্যাকচুয়ারি সংকটের কারণে অনেক সময় নতুন পণ্য উদ্ভাবন করতে সময়ক্ষেপণ হয়। তাই অ্যাকচুয়ারি বাড়ানো দরকার, যা বাংলাদেশে নেই। এজন্য বীমা খাত সংশ্লিষ্টদের পাশাপাশি রাষ্ট্রকেও বিশেষ ভুমিকা নিতে হবে। একইসাথে নিজ প্রতিষ্ঠান সর্ম্পকে বললেন এই বীমা ব্যক্তিত্ব। জানালেন সুন্দর স্বপ্নের কথা, চতুর্থ প্রজন্মের প্রতিষ্ঠান মেঘনা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনশক্তি তৈরীর পাশাপাশি তাদের যথাযথ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চত করতে সচেতন হয়ে কাজ করছে। একঝাঁক প্রশিক্ষিত তরুণ তৈরী করছে মেঘনা ইন্স্যুরেন্স, যারা আগামীর বাংলাদেশের বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক হবে।

মোহাম্মাদ আবু বকর সিদ্দিক অর্থবাংলাডটকমকে বলেন, গ্রাহকের আস্থা অর্জনের ক্ষেত্রে আমরা কোনো ছাড়
দিই না। বীমা দাবির অর্থ আমরা যথাসময়ে গ্রাহকদের পরিশোধ করে থাকি। এতে গ্রাহকরা আমাদের ওপর আস্থা
রাখছেন। নিত্যনতুন পণ্যের মাধ্যমে সেবা আমরা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিচ্ছি। স্মার্টফোনের অ্যাপের মাধ্যমে

আমরা মানুষকে বীমা সেবা দিতে চাই। এজন্য আমাদের তথ্যপ্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর কাজ চলছে। ডিজিটাল
বাংলাদেশে তথ্যপ্রযুক্তিগত দিকে বিশেষ নজর রেখে, উন্নত গ্রাহক সেবায় কাজ করছে সাধারণ বীমা প্রতিষ্ঠান।

সম্পর্কিত খবর