down of head

খতিয়ে দেখছে খতিয়েবিএসইসি
বাংলাদেশ ন্যাশনালের শেয়ার কারসাজি

অস্বাভাবিক বাড়ছে পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটিডের শেয়ার দর। আর এতেই কারসাজি সন্দেহ করছেন খোদ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন। ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির শেয়ার লেনদেন তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে বিএসইসি।

ন্যাশনালের প্রকৃত সম্পদ মূল্যের (এনএভিপিএস) চেয়ে দর ২৩২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। কোম্পানিটির শেয়ার দরের এই বৃদ্ধি অস্বাভাবিক মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এই সাধারণ বীমা প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের ব্যাপারে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করেছেন তারা।

এ প্রসঙ্গে বিএসইসির মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আবুল কালাম বলেন, অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধি ও লেনদেনের মাধ্যমে সম্ভাব্য কারসাজির অভিযোগে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির শেয়ার লেনদেন তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে বিএসইসি। আগামী ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জকে (ডিএসই) নির্দেশ দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। বিএসইসির সার্ভেইলেন্স বিভাগ থেকে ডিএসইকে চিঠি দিয়ে এ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, কমিশনের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, গত এক মাসে কোম্পানিটির শেয়ারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ও লেনদেনের প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এ কারণে সম্ভাব্য কারসাজি, কৃত্রিম বা সমন্বিত লেনদেন এবং সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে কি না, তা তদন্ত করে দেখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।।

জানা গেছে, একটি কোম্পানির শেয়ার প্রতি প্রকৃত সম্পদ বা নিট সম্পদ মূল্যের (এনএভিপিএস) চেয়ে বাজার দর অস্বাভাবিক বেশি হওয়া মানে শেয়ারটি অতিরিক্ত মূল্যায়িত বা ‘ওভারভ্যালুড’। সাধারণত বাজারে কৃত্রিম বা কারসাজির মাধ্যমে অথবা গুঞ্জনের মাধ্যমে এনএভিপিএস-এর তুলনায় শেয়ার দর অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়ে থাকে।

আরও জানা গেছে, চলতি বছরের অর্ধবার্ষিকীতে (জানুয়ারি-জুন, ২০২৬) বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্সের এনএভিপিএস এসে দাঁড়িয়েছে ৩৪ টাকা ২৬ পয়সা। আর গতকাল, ১৯ আগস্ট, ২০২৬ তারিখে কোম্পানিটির সমাপনী শেয়ার দর ছিল ১১৩ টাকা ৬০ পয়সা। এক্ষেত্রে কোম্পানিটির এনএভিপিএস-এর তুলনায় শেয়ার দর বেড়েছে ৭৯ টাকা ৩৪ পয়সা বা ২৩২ শতাংশ, যা অস্বাভাবিক বলেছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

এদিকে গত তিন মাসে কোম্পানিটির শেয়ার দর বেড়েছে ৩৯ শতাংশ, যা অস্বাভাবিক বলছেন বিশেষজ্ঞরা। গত ২০ মে, ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্সের শেয়ার দর ছিল ৮১ টাকা ৬০ পয়সা। আর বুধবার তা এসে দাঁড়িয়েছে ১১৩ টাকা ৬০ পয়সা, যা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। তিন মাসের ব্যবধানে শেয়ার দর বেড়েছে ৩২ টাকা।

সংশ্লিষ্টদের ধারণা, একটি চক্র বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্সের শেয়ার দর কারসাজির মাধ্যমে বৃদ্ধি করছে। এই অতি মূল্যায়িত শেয়ারে সাধারণ ও নিরীহ বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ করলে তাদের বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ শেয়ারটি কারসাজির মাধ্যমে অতিরিক্ত দাম বাড়িয়ে তা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করে চক্রটি মার্কেট থেকে চলে যাওয়ার পায়তারা করছে।

এদিকে কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদনে গড়মিলের আভাস পেয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। জানা গেছে, চলতি বছরের অর্ধবার্ষিকীতে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্সের প্রিমিয়ামসহ অন্যান্য আয় হয়েছে ৪৩ কোটি ৭ লাখ ৮৬ হাজার ৯৮৬ টাকা। এর আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ৩৫ কোটি ৮৫ লাখ ৩৬ হাজার ১৪৪ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির প্রিমিয়ামসহ অন্যান্য আয় বেড়েছে ৭ কোটি ২২ লাখ ৫০ হাজার ৮৪২ টাকা বা ২০ শতাংশ। এছাড়াও উল্লেখিত সময়ে কোম্পানির ম্যানেজমেন্ট এক্সপেনসেস, রি-ইন্স্যুরেন্স ও ক্লেইমস বা দাবিসমূহ এসে দাঁড়িয়েছে ২৪ কোটি ৫৮ লাখ ৭৪ হাজার ৭৯৯ টাকা। এর আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ৩৪ কোটি ২০ লাখ ৭৯ হাজার ৬১৮ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে ম্যানেজমেন্ট এক্সপেনসেস, রি-ইন্স্যুরেন্স ও দাবিসমূহ বাবদ ব্যয় কমেছে ৯ কোটি ৬২ লাখ ৪ হাজার ৮১৯ টাকা বা ২৮ শতাংশ।

বিশেষেজ্ঞদের মতে, সাধারণত কোনো বিমা কোম্পানির প্রিমিয়ামসহ অন্যান্য আয় বাড়লে ম্যানেজমেন্ট এক্সপেনসেস বৃদ্ধি পায়। কিন্তু বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্সের ক্ষেত্রে হয়েছে উল্টোটি। অর্থাৎ কোম্পানিটির প্রিমিয়ামসহ অন্যান্য আয় বাড়লেও ম্যানেজমেন্ট এক্সপেনসেস কমেছে। প্রফিট বা মুনাফা বেশি দেখানোর উদ্দেশ্যেও কোম্পানি কর্তৃপক্ষ এমন ছলচাতুরির আশ্রয় নিয়ে থাকতে পারে বলে তারা মত প্রকাশ করেছেন।

এদিকে কোম্পানিটি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করেছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। গত সাত মাসে কোম্পানিটিতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মালিকানা কমেছে ৮ শতাংশ। গত ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৫ তারিখে কোম্পানিটিতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মালিকানা ছিল ৩৩ দশমিক ৭৪ শতাংশ। আর ৩১ জুলাই, ২০২৬ তারিখে তা এসে দাঁড়িয়েছে ৩১ শতাংশ।

বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের নেতৃবৃন্দরা বলেন, যেকোনো কোম্পানির এনএভিপিএসের তুলনায় শেয়ার দর অস্বাভাবিক বৃদ্ধি মোটেও ভালো লক্ষণ নয়। অধিকাংশ সময় কারসাজির কারণে এমনটি হয়ে থাকে। এ ব্যাপারে বিএসইসিকে কারসাজি চক্রের বিরুদ্ধে খুব শিগগিরই তদন্ত সাপেক্ষ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তাহলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা উপকৃত হবেন।

ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্সের পরিশোধিত মূলধন ৪৪ কোটি ২৫ লাখ টাকা, যেখানে সাধারণ বিনিয়োগকারী ছাড়াও উদ্যোক্তা পরিচালকদের মালিকানা রয়েছে ৬০ দশমিক ১৩ শতাংশ এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের মালিকানা রয়েছে ৮ দশমিক ৮৭ শতাংশ।

এনএলআই সিকিউরিটিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সাহেদ ইমরান বলেন, যে কোম্পানি ওভারভ্যালুড অবস্থায় রয়েছে, সেটির ব্যাপারে বিএসইসিসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তাহলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা উপকৃত হবেন অনেক সময় কোম্পানি কর্তৃপক্ষ এসব কারসাজির সাথে জড়িত থাকে। তাই ভালোভাবে তদন্ত করে কারসাজির সাথেই যারাই জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।

সম্পর্কিত খবর