প্রগ্রেসিভ লাইফকে বেকায়দায় ফেলতে বেনামি চিঠি!
২০১৩ সাল থেকে দীর্ঘ ছয় বছর ধরে বন্ধ ছিল প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্সের বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম)। এই সময়ে বিনিয়োগকারীদের কোনো লভ্যাংশ না দেয়ায় এবং গ্রাহকরা দাবির টাকা পেতে হয়রানির শিকার হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি নিয়ে হতাশায় ভুগতে থাকে গ্রাহক ও বিনিয়োগকারীরা। নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে অবশেষে ২০১৯ সালে এজিএম করার অনুমোদন পায় প্রতিষ্ঠানটি। বিনিয়োগকারীদের মাঝে নেমে আসে স্বস্তি। কিন্তু ফের প্রতিষ্ঠানটিকে ঘিরে ষড়যন্ত্র হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। কোম্পানি থেকে অপসারিত কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ কর্তৃপক্ষের।
জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদ ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষসহ বিভিন্ন সংস্থায় বেনামি চিঠি পাঠায় একটি চক্র। এতে প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান কোম্পানি সচিবকে সম্পৃক্ত করে তার পূর্বের কর্মস্থল হোমল্যান্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্সের বিষয়ে বিভিন্ন অভিযোগ তোলা হয়।
অভিযোগে বলা হয়, বর্তমান কোম্পানি সচিব জহির উদ্দিন ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স ও হোমল্যান্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্সে চাকরিকালে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এজন্য তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। এছাড়া হোমল্যান্ড লাইফে থাকাকালে পরিচালক মফিজ উদ্দিনের বিরুদ্ধে শেয়ার সার্টিফিকেট চুরির অভিযোগ এবং ওই পরিচালককে ঋণ দেয়া প্রতিষ্ঠানের চিঠিতে শেয়ারের পরিমাণকে সত্যায়ন করে তাকে সহায়তা করেছেন বলে মামলার অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে। আবার প্রতিষ্ঠানটির এক পরিচালককেও হুমকি দিয়েছেন। তাছাড়া বিভিন্ন সময়ে কোম্পানির মামলার খরচ বাবদ ব্যয় দেখিয়ে কর্তৃপক্ষের অনুমোদনে ৯ লাখ ৪৪ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেন। এসব কারণে তার বিরুদ্ধে তিনটি মামলা দায়ের করা হয় প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে। বর্তমান প্রতিষ্ঠান প্রগ্রেসিভ লাইফ নিয়ে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, সুকৌশলে একাধিক পদ দখল করে আছেন। এখানে যে বিষয় লক্ষ্যনীয় তা হলো, প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্সে একাধিক পদে থাকা ছাড়া তার বিরুদ্ধে বর্তমান প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত অন্য কোনো অভিযোগ নেই। অধিকাংশ অভিযোগই হোমল্যান্ড লাইফে চাকরি করার সময়ে।
তবে অনুসন্ধানে এসব অভিযোগও সত্য নয় বলে দেখা গেছে। খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স থেকে অব্যহতি নিতে ২০০৩ সালের ৩০ ডিসেম্বর পদত্যাগ পত্র জমা দেন জহির উদ্দিন। কিন্তু কোম্পানি কর্তৃপক্ষ তা গ্রহণ না করে তাকে চাকরিতে বহাল থাকার অনুরোধ করেন। কিন্তু এতে রাজি না হলে অবশেষে ২০০৪ সালের ১ এপ্রিল থেকে তার পদত্যাগ পত্র গৃহিত হয়েছে বলে চিঠি দিয়ে অবহিত করে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ। তাছাড়া চাকরি বিধি অনুসারে তার প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুয়িটিসহ সকল পাওনা পরিশোধ করে দেয়া হয়।
অপরদিকে হোমল্যান্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্স থেকে তাকে অব্যহতি দেয়া হয় ২০১৭ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি। অব্যহতি পত্রে উল্লেখ করা হয়, তাকে প্রয়োজন নেই বিধায় অব্যহতি দেয়া হলো। কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তোলা হয়নি। এমনকি অব্যহতির আগে অনিয়মের অভিযোগে তাকে কোনো নোটিশও দেয়া হয়নি। তাছাড়া নিয়ম মোতাবেক তার সকল পাওনা পরিশোধ করতে হোমল্যান্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্সের যমুনা ব্যাংক হিসাব নম্বর (এসি নং- ০১৮-০৩২০০০১০৩৮) থেকে ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ তারিখে চেক প্রদান করে। এর পরদিন অর্থাৎ ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ তারিখে তাকে ছাড়পত্র (সূত্র নং- হোলাইকো/প্রঃকাঃ/ প্রশাঃ ৫১৩৪৮/২০১৭) প্রদান করা হয়। এই ছাড়পত্র বিষয়ে আইডিআরএ থেকে হোমল্যান্ডের কাছে জানতে চাওয়া হয়। এর প্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠানটির সিইও ড. বিশ্বজিৎ কুমার ম-ল ছাড়পত্রটি সত্যায়ন করে এর সঠিকতা নিশ্চিত করে।
মূলত হোমল্যান্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্সের তৎকালীন সিইও আজিজুল ইসলাম তালুকদারকে অপকর্মে সহায়তায় অস্বীকৃতি জানালে প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে তাকে হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলা দেয়া হয় বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগী জহির উদ্দিন। চাকরি থেকে অব্যহতি দেয়ার প্রায় দেড় বছর পর তার বিরুদ্ধে এই মামলা দায়ের করা হয়।
প্রাপ্ত তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, কোম্পানি থেকে ৯ লাখ ৪৪ হাজার টাকা অর্থ আত্মসাৎ মামলাটির আইনাগত ভিত্তি না থাকায় গত ১৪ জানুয়ারি ২০১৯ তারিখে চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত সেই মামলা থেকে জহির উদ্দিনকে অব্যহতি দেন। এছাড়া হোমল্যান্ড লাইফের পরিচালক হোসনে আরা নাজকে হুমকি দেয়ার বিষয়টি পর্যালোচনায় সঠিক প্রমাণিত হয়নি। ফলে এই মামলা থেকেও গত ১৭ আগস্ট ২০২০ তারিখে তাকে অব্যহতি দেন জেলা দায়রা জজ এবং দ্রুত বিচার ট্রাইবুনাল-৪ বিচারক জেসমিন আরা বেগম।
শুধু শেয়ার সার্টিফিকেট হারিয়ে যাওয়া সংক্রান্ত মামলাটি চলমান রয়েছে। উক্ত মামলার আইও ফটোকপি জব্দ করে মূলকপি উদ্ধার করতে পারে নাই। ফরেনসিক বিভাগ সিআইডি সবশেষ পুলিশ সুপার স্মারক ন. ফরেনসিক হস্তলিপি শাখা এইচ এম-১০২৪২০১৭/১২৮৪/২০৭৭ফঃ ২২/৫/১৭ মতে ফটোকপির বিষয় পরীক্ষার উপযোগী নয় এবং পরীক্ষার অন্তুর্ভুক্ত করা গেল না মর্মে প্রতিবেদন দেয়। এতে প্রতীয়মান মামলাটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
তবে এই মামলার ক্ষেত্রেও চলতি বছরের ১৩ মার্চ স্থগিতাদেশ দেয় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এবং পূর্বাপর ঘটনা অনুসন্ধানে জানা যায়, হোমল্যান্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্সের পরিচালক মফিজ উদ্দিন তার শেয়ার বন্ধক রেখে ন্যাশনাল হাউজিং ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট (এনএইচএফআই) থেকে লোন নিতে কোম্পানির শেয়ার জামানত রাখেন। পরে জামানতকৃত শেয়ারের সংখ্যা সঠিক আছে কিনা, তা জানতে এনএইচএফআই থেকে তৎকালীন কোম্পানি সচিব শফিকুল ইসলামকে চিঠি দেয়া হয়। এনএইচএফআই প্রেরিত চিঠিতে শেয়ারের বিবরণী সঠিক আছে কিনা, তা যাচাই করতে আইন কর্মকর্তা জহির উদ্দিনকে নির্দেশ দেন কোম্পানি সচিব। এর প্রেক্ষিতে পত্রে উল্লেখিত বিবরণ সঠিক আছে বলে মতামত দেন তিনি। পরবর্তীতে কোম্পানি সচিব শফিকুল ইসলাম পত্র মাধ্যমে ন্যাশনাল হাউজিং ফাইন্যান্সকে জানায় তাদের প্রেরিত পত্রে যে তথ্য জানতে চাওয়া হয়েছে তা সঠিক। অবশ্য ২০০৭ সালে এই ঘটনার অনেক আগেই হোমল্যান্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্সে পরিচালক মফিজ উদ্দিনের ধারণকৃত শেয়ার সম্পর্কে সত্যায়ন করেছে তৎকালীন বিমা অধিদফতর ও রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মস (আরজেএসসি)।
গ্রাহক ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির কিছু উদ্যোগ:
শতকোটি টাকারও বেশি বকেয়া দাবি পরিশোধে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এজন্য এফডিআর ভেঙে ৪৫ কোটি টাকা দেয়া হবে এবং গত বছর ৪৬ কোটি টাকা দাবি পরিশোধ করা হয়েছে। অপ্রয়োজনীয় অফিস বন্ধ করে অযাচিত খরচ নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। অপরদিকে নানা চক্রান্তে এজিএম বন্ধ থাকলেও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে প্রতিষ্ঠানটি তাদের প্রাপ্য লভ্যাংশ সংরক্ষণ করছে। এক্ষেত্রে এজিএম আয়োজনে উচ্চ আদালতের শরাণাপন্ন (Progressive Life Company Matter No: ০৮/২০২২) হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। বিলম্ব মওকুফের জন্য দরখাস্ত করে উচ্চ আদালতের নিকট। কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, বিষয়টি এখন শুনানীর অপেক্ষায় আছে। অচিরেই মামলাটি নিষ্পত্তি হবে এবং কোম্পানি এজিএমে ফিরে আসবে।



