দাবি আদায়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে একের পর এক কর্মসূচি
নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়ে ব্যাংকিং খাত সংস্কারে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। জাতির উদ্দেশে দেওয়া প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্যে উঠে এসেছে এ খাতে লুটপাট ঠেকাতে সংস্কারের প্রয়োজনীতার বিষয়টি। নতুন সরকারের অর্থ উপদেষ্টা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নবনিযুক্ত গভর্নর এ খাতে সংস্কারে কাজ শুরু করেছেন। ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়ম হয়েছে এমন কয়েকটি ব্যাংকের পর্ষদ ইতোমধ্যে ভেঙে পুনর্গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তা বিভিন্ন দাবিতে একের পর এক মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচি নিয়ে সক্রিয় হচ্ছেন।
সরকার পরিবর্তনের তিন সপ্তাহ না পেরোতেই আজ মঙ্গলবার দ্বিতীয় দিনের মতো মানববন্ধন কর্মসূচি ঘোষণা করে কর্মকর্তাদের একটি অংশ। তবে ব্যাপক সমালােচনার মুখে গতকাল রাতে তা স্থগিত করা হয়। মানববন্ধনের কারণ উল্লেখ করে বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স কাউন্সিলের পক্ষ থেকে কর্মকর্তাদের ফেসবুক মেসেঞ্জার গ্রুপে দেওয়া বার্তায় বলা হয়, আগস্টভিত্তিক পদোন্নতি নিয়ে কাউন্সিল কাজ করছে। এ ছাড়া কর্মীদের সর্বোচ্চ উৎসাহ বোনাস, বঞ্চিতদের পদোন্নতির ব্যবস্থা, অযৌক্তিকভাবে বন্ধ করা ইনক্রিমেন্ট পুনর্বহাল, পদোন্নতির জন্য ব্যাংকিং ডিপ্লোমা বাধ্যতামূলক করার বিধান বাতিল ও বিদেশ ভ্রমণ নীতিমালা সহজ করার দাবি রয়েছে তাদের। গত বৃহস্পতিবার এসব দাবিতে তারা মানববন্ধন করেন। এর আগে গত সপ্তাহে গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের সঙ্গে কর্মকর্তাদের একটি দল দেখা করে সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোসহ বিভিন্ন দাবি জানায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অফিসার্স কাউন্সিলের পক্ষ থেকে সরকার পতনের পরই একটি সংবাদ সম্মেলন করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিলুপ্তসহ বিভিন্ন দাবি উত্থাপন করা হয়। দায়িত্ব নেওয়ার এত অল্প সময়ে এভাবে একের পর এক দাবি নিয়ে গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছেন বলে জানা গেছে।
গত ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর অনেকের মতো আত্মগোপনে চলে যান আব্দুর রউফ তালুকদার। গত ৯ আগস্ট সাপ্তাহিক ছুটির দিনে অজ্ঞাত স্থান থেকে তিনি অনলাইনে পদত্যাগপত্র পাঠান অর্থ মন্ত্রণালয়ে। এর আগে গত ৬ আগস্ট সরকার পতনের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকে নজিরবিহীন বিক্ষোভ হয়। বিক্ষোভের মুখে ডেপুটি গভর্নর কাজী ছাইদুর রহমান, খুরশীদ আলম, বিএফআইইউ প্রধান মো. মাসুদ বিশ্বাস ও নীতি উপদেষ্টা আবু ফরাহ মো. নাছের পদত্যাগে বাধ্য হন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা জানান, আব্দুর রউফ তালুকদার ও ফজলে কবির গভর্নরের দায়িত্ব নেওয়ার পর কিছু সুযোগ-সুবিধা কমানোর বিষয়টি ঠিক। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়নে সাধারণত হস্তক্ষেপ হয় না। ফলে মানবসম্পদ ইস্যুতে সামগ্রিকভাবে বড় ধরনের কোনো অসন্তোষ থাকার কথা নয়। বরং ঠিকমতো পরিদর্শন করতে না পারা, অনিয়ম জেনেও বাধ্য হয়ে চুপ থাকা এবং ব্যাংকিং খাতের নীতি নির্ধারণী সিদ্ধান্ত বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়ার মতো বিষয় নিয়ে অসন্তোষ ছিল। এ সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সব পর্যায় থেকে কীভাবে ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো যায়, তা নিয়ে আলোচনা বা প্রস্তাবনা আসার কথা। তা না করে শুধু নিজেদের দাবি নিয়ে একের পর এক কর্মসূচি দেওয়ার বিষয়টি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করছে।
কর্মকর্তারা জানান, সরকার পরিবর্তনের পর ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর নানাভাবে প্রভাব খাটিয়েছেন বিভিন্ন ব্যাংকের এমন চেয়ারম্যান ও পরিচালকদের অনেকেই পদত্যাগ করেছেন। কিছু এমডি আত্মগোপনে চলে গেছেন। বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে চাকরি হারানো বা পদোন্নতি বঞ্চিতরা আন্দোলন করছেন। অন্যায়ভাবে নিয়ন্ত্রণ নেওয়া কিছু ব্যাংকে বিভিন্ন কর্মসূচি দেওয়া হচ্ছে। সাধারণভাবে এমন পরিস্থিতিতে আমানতকারীদের মধ্যে এক ধরনের আস্থাহীনতা তৈরি হয়। এ সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে একের পর এক এ ধরনের কর্মসূচি চলতে থাকলে ব্যাংকিং খাতে অস্থিরতা আরও বাড়বে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের দু’জন নির্বাহী পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে সমকালকে বলেন, বিভিন্ন অনিয়মে সহায়তার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার পরিবর্তনের পর ডেপুটি গভর্নরসহ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। কিছু কর্মকর্তা জোটবদ্ধ হয়ে জোর করে তাদের পদত্যাগে বাধ্য করেন, যা দুঃখজনক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ ঘটনার পরই মূলত বিভিন্ন ব্যাংকে এ ধরনের বিশৃঙ্খলা হয়েছে। তারা বলেন, নতুন গভর্নর কেবল কাজ শুরু করেছেন। এ সময় সব দাবি একসঙ্গে দ্রুত পূরণের জন্য চাপ সৃষ্টি করা ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা কাটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করবে।
এন এস



