খাদ্যপণ্যের বৈশ্বিক দাম কমতে শুরু করেছে
বিশ্বজুড়ে খাদ্যপণ্যের দাম টানা দ্বিতীয় মাসের মতো কমেছে। ভোজ্যতেলের নিম্নমুখী দাম এক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। গতকাল জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে আসে।
মে মাসে এফএওর খাদ্যপণ্যের মূল্যসূচক এক মাসের ব্যবধানে দশমিক ৬ শতাংশ কমেছে। এর আগের মাসের মূল্যসূচক কমেছিল দশমিক ৮ শতাংশ। সূচক দাঁড়িয়েছে ১৫৭ দশমিক ৪ পয়েন্টে। সংস্থাটি মূলত প্রতি মাসে মাংস, দুগ্ধপণ্য, দানাদার খাদ্যশস্য, ভোজ্যতেল ও চিনির গড় দামের ওপর ভিত্তি করে মূল্যসূচক প্রকাশ করে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাসওয়ারি খাদ্যপণ্যের দাম কমলেও তা রেকর্ড সর্বোচ্চের কাছাকাছি অবস্থান করছে। গত মার্চে মূল্যসূচকে রেকর্ড উল্লম্ফন দেখা দিয়েছিল। রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে যুদ্ধ অব্যাহত থাকায় বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে বৈশ্বিক বাণিজ্য। এ কারণেই মার্চে খাদ্যপণ্যের মূল্যসূচক ১১ বছরের সর্বোচ্চে পৌঁছেছিল।
মূলত কয়েক বছর ধরেই খাদ্যপণ্যের দাম তীব্র মাত্রায় বাড়ছে। মহামারীজনিত সরবরাহ চেইনে সংকট, ভয়াবহ বৈরী আবহওয়া দাম বাড়াতে সহায়তা করেছে। এর মধ্যেই চলতি বছর ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের সূত্রপাত হলে পরিস্থিতি আরো খারাপ আকার ধারণ করে। তার ওপর ভারতের গম ও মালয়েশিয়ার পাম অয়েল রফতানি বন্ধের ঘোষণার কারণে বাজারে ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়।
তবে গত মাসের শেষ দিকে পাম অয়েল রফতানিতে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নেয় বিশ্বের শীর্ষ রফতানিকারক দেশ ইন্দোনেশিয়া। ফলে ভোজ্যতেলের বাজার নিম্নমুখী হতে শুরু করে। মে মাসে ভোজ্যতেলের বৈশ্বিক দাম এক মাসের ব্যবধানে কমেছে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ।
তথ্য বলছে, ইন্দোনেশিয়া গত এপ্রিলের শেষ দিকে পাম অয়েল রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। উদ্দেশ্য ছিল স্থানীয় বাজারে পণ্যটির ঊর্ধ্বমুখী মূল্য নিয়ন্ত্রণ ও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা। দেশটি এমন সময় পাম অয়েল রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, যখন ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে এমনিতে ভোজ্যতেলের ভয়াবহ সংকট চলছিল। কারণ ইউক্রেন যুদ্ধের আগে বিশ্বের শীর্ষ সূর্যমুখী তেল রফতানিকারক ছিল।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত মাসে দুগ্ধপণ্যের দাম এপ্রিলের তুলনায় ৩ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে। এর কারণ হিসেবে তারা জানান, চীন বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দুগ্ধপণ্য ব্যবহারকারী দেশ। কিন্তু কঠোর লকডাউনের কারণে দেশটিতে এসব পণ্যের ব্যবহার কমে গিয়েছে। দুর্বল চাহিদা থাকায় আমদানি কমিয়ে দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
তবে মাংস ও গমের দামে ঊর্ধ্বমুখিতা এখনো অব্যাহত আছে। এর পেছনে দায়ী করা হচ্ছে চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে। মূল্যসূচকে অন্যান্য পণ্যের মধ্যে দানাদার খাদ্যশস্যের দাম সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। গমের বৈশ্বিক উৎপাদনের প্রায় ১৩ শতাংশই আসে রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে। কিন্তু রাশিয়া গত ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে হামলা চালানোর পর থেকেই দেশ দুটিতে উৎপাদন সম্ভাবনা কমছে। এ কারণে বাড়ছে দাম। যদিও ২০০৮ সালের রেকর্ড পর্যায় থেকে দাম কিছুটা কমেছে।
তথ্য বলছে, চলতি বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে গমের ভবিষ্যৎ সরবরাহ মূল্য প্রায় ৪৮ শতাংশ বেড়েছে। এছাড়া খাদ্যশস্যের দাম বাড়ার পেছনে ভারতের গম রফতানি নিষেধাজ্ঞাও ভূমিকা পালন করেছে। মূলত স্থানীয় বাজারে দাম বেড়ে যাওয়া ও উৎপাদন ঘাটতি মেটাতেই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটি।
এদিকে এফএওর মূল্যসূচক অনুযায়ী, গত মাসে মাংসের দাম বেড়ে রেকর্ড সর্বোচ্চে আরোহণ করেছে। ইউক্রেনে সরবরাহ চেইনে সংকট এক্ষেত্রে জ্বালানি জুগিয়েছে। মহামারীর পর থেকেই মূলত মাংসের দাম বাড়ছে। চলমান শ্রমিক সংকট, সার ও জ্বালানি পণ্যের দামে ঊর্ধ্বগতি পণ্যটির দামকে আরো সামনের দিকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে।



