বিএসইসির কপার ওয়্যার প্লান্ট প্রকল্প
৫ কোটি টাকা সাশ্রয়ে প্রকল্প শেষ করল জাপানি ঠিকাদার
গাজী ওয়্যারস লিমিটেড শিল্প মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশনের (বিএসইসি) কপার ওয়্যার প্রস্তুতকারী একটি প্রতিষ্ঠান। পাকিস্তান আমলে প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিটি ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রীয়করণ করা হয়। তামার তার উৎপাদনে দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানটির নতুন একটি প্লান্ট স্থাপন প্রকল্প নির্ধারিত সময়ের আগে সম্পন্ন করে ৫ কোটি টাকা অর্থ সাশ্রয় করেছে জাপানি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। মেয়াদের আগেই কাজ শেষ করে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়ায় দেশের মোট চাহিদার দুই-তৃতীয়াংশ কপার ওয়্যার সরবরাহ করতে পারবে রাষ্ট্রয়াত্ত গাজী ওয়্যারস লিমিটেড।
গাজী ওয়্যারস লিমিটেডকে শক্তিশালী ও আধুনিকীকরণ শীর্ষক প্রকল্পটি হাতে নেয়া হয় ২০১৭ সালে। ডিপিপি প্রস্তুতের পর ২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবর ৬৯ কোটি টাকার প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন হয়। ২০১৮ সালে কাজ শুরু হওয়া তিন বছরের প্রকল্পটির ২০২১ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার কথা ছিল। গত দুই বছর মহামারীর প্রকোপ ও লকডাউন থাকা সত্ত্বেও কোনো ধরনের সময়ক্ষেপণ ছাড়াই ২০২১ সালের জুনের মধ্যেই প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হয়। গত ১৯ জুলাই প্রকল্পটির ট্রায়াল রানের মাধ্যমে উৎপাদনে
যায় গাজী ওয়্যারস। সর্বশেষ ২৩ নভেম্বর থেকে বাণিজ্যিক উৎপাদনে রয়েছে নতুন স্থাপিত সুপার এনামেল কপার ওয়্যারস উৎপাদনের বিশেষায়িত কারখানাটি।
বিএসইসি তথ্যমতে, প্রকল্পটির ডিপিপিতে প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ৬৮ কোটি ৯৮ লাখ ৫৩ হাজার টাকা। সর্বশেষ প্লান্ট বুঝিয়ে দেয়ার সময় প্রকল্প ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ব্যয় করেছে ৬৪ কোটি টাকারও কম। প্রায় ছয় দশক আগে স্থাপিত কারখানাটিতে জাপানি ফুরুকাওয়া কোম্পানির মেশিনারিজ দিয়ে নতুন প্ল্যান্ট স্থাপনের কাজ শেষ করে জাপানি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ডায়মন্ড প্রজেক্ট কোম্পানি লিমিটেড। নির্ধারিত সময়ের আগেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সফলভাবে ট্রায়াল রান ও বাণিজ্যিক উৎপাদনের মাধ্যমে প্লান্ট গাজী ওয়্যারসের প্রকৌশল বিভাগের কাছে বুঝিয়ে দিয়েছে। এতে প্রকল্পের ৫ কোটি টাকা অর্থ সাশ্রয় ছাড়াও বার্ষিক প্রায় দুই হাজার টন বিভিন্ন ক্যাটাগরির তামার তার উৎপাদনের কার্যক্রম পুরোদমে চালিয়ে যাচ্ছে গাজী ওয়্যারস কর্তৃপক্ষ।
গাজী ওয়্যারস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ সাব্বির আওয়াল বলেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে সুনামধারী কপার ওয়্যারস প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান গাজী ওয়্যারস। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান হলেও গুণগত মান বজায় রেখে লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেশের সিংহভাগ কপার ওয়্যার সরবরাহ করছে গাজী। নির্ধারিত সময়ের আগে কাজ শেষ করে প্রাক্কলিত প্রকল্প ব্যয়ের ৫ কোটি টাকা সাশ্রয় করেছে। কারখানার নতুন প্লান্ট স্থাপনের মাধ্যমে গাজী ওয়্যারস দেশের কপার ওয়্যারের ৫০ শতাংশের বাজারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, গাজী ওয়্যারস লিমিটেড শিল্প মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন বিএসইসির অধীনস্থ বাংলাদেশে প্রথম ও সর্ববৃহৎ উত্কৃষ্ট মানের সুপার এনামেল কপার ওয়্যারস প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান। গাজী ওয়্যারস দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে প্রায় পাঁচ দশক ধরে কাজ করে আসছে। প্রতিষ্ঠানটি ১৯৬৫ সালে ব্যক্তি মালিকানায় জাপানের বিখ্যাত ফুরুকাওয়া ইলেকট্রিক কোম্পানির কারিগরি সহযোগিতায় বার্ষিক প্রায় ২৫০ টন উৎপাদন ক্ষমতা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ সরকার পিও নং-২৭ অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটিকে অধিগ্রহণ করে বিএসইসির কাছে হস্তান্তর করে।
গাজী ওয়্যারস মূলত তিন ধরনের কপার ওয়্যার প্রস্তুত করে। এর মধ্যে ১১ থেকে ৪৬ এসডব্লিউজি সাইজের সুপার এনামেল কপার ওয়্যার, ১০ থেকে ৪৬ এসডব্লিউজি সাইজের এনিল্ড কপার ওয়্যার এবং ১০ থেকে ৪৬ এসডব্লিউজি সাইজের হার্ডড্রন বেয়ার কপার ওয়্যার। প্রতিষ্ঠানটি ব্রিটিশ স্ট্যান্ডার্ড স্পেসিফিকেশন (বিএসএস) ও বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড স্পেসিফিকেশন (বিডিএস) অনুযায়ী কপার ওয়্যার প্রস্তুত করে থাকে। স্বাধীনতা উত্তরকালে সরকার নিয়ন্ত্রিত পিডিবি, জুট মিলস, রেলওয়েসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের চাহিদার ওপর ভিত্তি করে এ কারখানা নির্মিত হলেও বর্তমানে বেসরকারি খাতের জন্যও গুণগত মানসম্পন্ন কপার পণ্য উৎপাদন ও বিপণন করছে।
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, আগে গাজী ওয়্যারসের কারখানার বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ছিল ৪০০ টন। বর্তমানে বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা দুই হাজার টন ছাড়িয়ে যাবে। যদিও দেশের বার্ষিক কপার ওয়্যারের চাহিদা তিন হাজার টন। গাজী ওয়্যারস গুণগত মান বজায় রাখতে শতভাগ কন্ডাক্টিভিটি সম্পন্ন আট মিলি মিটারের ডায়া বিশিষ্ট ইলেকট্রলাইটিক কপার রড আমদানি করে। মূলত ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানি করা এ কাঁচামালের বিশুদ্ধতা বা পিওরিটি ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ। গুণগত মানের জন্য গাজী ওয়্যারস বিডিএস, বিএসএস, আইইসি, জেআইএসসির মান ও সার্টিফিকেট অর্জন করেছে। গাজীর উৎপাদিত কপার ওয়্যার বিভিন্ন রকমের ট্রান্সফারমার, মোটরের কয়েল নির্মাণে ব্যবহূত হলেও এসব পণ্য সহজে পোড়ে না, ক্ষতি কম হয়, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী হয়, দীর্ঘকাল সার্ভিস দিতে পারে, মেরামত খরচ ও মেশিন ব্রেক-ডাউন কম হয়। এ তারের কারণে বিদ্যুতের সিস্টেম লস কম হওয়ায় পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ গাজী ওয়্যারসের সবচেয়ে বড় ক্রেতা প্রতিষ্ঠান।
গাজী ওয়্যারস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে লাভের ধারায় রয়েছে গাজী ওয়্যারস। মূলত গুণগত মানসম্পন্ন কপার ওয়্যার উৎপাদনের মাধ্যমে গাজী ওয়্যারস সরকারি প্রতিষ্ঠান সত্ত্বেও লাভজনক ধারায় রয়েছে। গাজী ওয়্যারসের পণ্যের চাহিদা বেশি থাকলেও প্রায় ৫ দশকের পুরনো প্লান্ট দিয়ে বিপুল এই চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছিল না। এ কারণে বিএসইসি নেয়া প্রকল্পের মাধ্যমে মাত্র তিন বছরের মধ্যেই কোনো ধরনের সময়ক্ষেপণ ছাড়াই প্রায় পাঁচ গুণ উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন নতুন প্লান্ট স্থাপন করা হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দক্ষতার পাশাপাশি গাজী ওয়্যারসের নতুন প্লান্ট স্থাপনে সরকারি ক্রয় ও প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিএসইসি বিশেষ দক্ষতা দেখিয়েছে বলে মনে করছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।


