স্কয়ার, রেনাটাসহ ছয় প্রতিষ্ঠান বিদেশে বিনিয়োগ বাড়াতে আগ্রহী

দেশের বাইরে ব্যবসা সম্প্রসারণে এরই মধ্যে বিদেশে কোম্পানি খুলেছে এমন দুটি প্রতিষ্ঠান সেখানে বিনিয়োগ বাড়ানোর আবেদন করেছে। এছাড়া দেশের বাইরে কোম্পানি খোলাসহ যৌথ বিনিয়োগ করতে চায় আরো চারটি প্রতিষ্ঠান। অনুমোদনের জন্য এসব প্রতিষ্ঠানের আবেদন পর্যালোচনার জন্য আগামী ২ ফেব্রুয়ারি বৈঠকে বসছে দেশী উদ্যোক্তাদের বিদেশে বিনিয়োগের আবেদন প্রস্তাব মূল্যায়ন কমিটি। অনুমোদন পেলে প্রতিষ্ঠানগুলো প্রাথমিক পর্যায়ে বিদেশে প্রায় ৮৬ কোটি টাকার সমপরিমাণ অর্থ (সর্বশেষ বিনিময় হার অনুযায়ী) বিনিয়োগ করবে। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

দেশের বাইরে কোম্পানি খোলার জন্য আবেদন করা তিনটি প্রতিষ্ঠান হচ্ছে স্কয়ার গ্রুপের স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড, এম অ্যান্ড জে গ্রুপের কলম্বিয়া গার্মেন্টস লিমিটেড এবং মেঘনা গ্রুপের সোনারগাঁ সিড ক্রাশিং মিলস লিমিটেড। এছাড়া বাংলাদেশ ভেঞ্চার ক্যাপিটাল লিমিটেড স্পেনে যৌথ বিনিয়োগ করতে আগ্রহী। এদিকে দুটি প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে দেশের বাইরের তিন দেশে কোম্পানি খুলেছে। এবার সেসব জায়গায় বিনিয়োগ বাড়াতে চায় তারা। প্রতিষ্ঠান দুটি হলো বিএসআরএম লিমিটেড এবং রেনাটা লিমিটেড। উদ্যোক্তাদের বিদেশে বিনিয়োগের এসব আবেদন পর্যালোচনায় আগামী ২ ফেব্রুয়ারি প্রস্তাব মূল্যায়ন কমিটির চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ড. আবুল কালাম আজাদের সভাপতিত্বে সভা অনুষ্ঠিত হবে। এতে অর্থ মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রতিনিধিদের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রস্তাব মূল্যায়ন কমিটির চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ড. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য এসব প্রতিষ্ঠানকে দেশের বাইরে বিনিয়োগ করতে দেয়ার বিষয়টি সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিবাচকভাবে দেখছে। আগামী ২ ফেব্রুয়ারি এ বিষয়ে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সঙ্গে বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। বৈঠকেই এসব প্রস্তাবের অনুমোদন চূড়ান্ত হবে।

অনুষ্ঠিতব্য বৈঠকের কার্যপত্র সূত্রে জানা গিয়েছে, ফিলিপাইনে একটি সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান খোলার জন্য মূলধন হিসেবে বিনিয়োগ করার আবেদন করেছে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড। নিজস্ব রফতানি প্রত্যাবাসন কোটার (ইআরকিউ) হিসাব থেকে ১০ লাখ ডলার মূলধন বিনিয়োগের মাধ্যমে সাবসিডিয়ারি হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি স্থাপন করতে চায় স্কয়ার ফার্মা। বাংলাদেশী মুদ্রায় এ বিনিয়োগের পরিমাণ ৮ কোটি ৬০ লাখ টাকা।

বিনিয়োগের উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়, ফিলিপাইনের আমদানিনির্ভর ফার্মাসিউটিক্যালস বাজারের আকার প্রায় ৬০০ কোটি ডলার, যা আসিয়ান অঞ্চলে তৃতীয় বৃহৎ ফার্মাসিউটিক্যালস পণ্যের বাজার। ফিলিপাইন ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এফডিএ) রেজিস্ট্রেশন ছাড়া নিজস্ব ব্র্যান্ড নামে সে দেশে ফার্মাসিউটিক্যালস পণ্য বাজারজাত করার সুযোগ নেই। তাই স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস ফিলিপাইনে এসব পণ্য রফতানি করলেও তা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে বাজারজাত করতে হচ্ছে। এ কারণে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস তাদের নিজস্ব ব্র্যান্ড নাম ব্যবহার করতে পারছে না। প্রস্তাবিত শতভাগ মালিকানাধীন সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তারা নিজস্ব ব্র্যান্ড নামে ফিলিপাইনে তাদের প্রায় ৫০টি রেজিস্টার্ড প্রডাক্ট বাজারজাত করতে পারবে।

এ প্রসঙ্গে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের জেনারেল ম্যানেজার (ইন্টারন্যাশনাল মার্কেটিং অ্যান্ড বিজনেস ডেভেলপমেন্ট) প্রসেনজিৎ চক্রবর্তী বলেন, ফিলিপাইন আমাদের জন্য অনেক বড় বাজার। ওখানে আমাদের নিজস্ব প্রতিনিধি থাকলে ব্যবসা সম্প্রসারণ করা সহজ হবে। তাই সেখানে একটি সাবসিডিয়ারি স্থাপনের জন্য আমরা আবেদন করেছি। যেটা অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

বাংলাদেশ স্টিল রি-রোলিং মিলস লিমিটেড (বিএসআরএম) হংকংয়ে ২০১৮ সালে বিএসআরএম (হংকং) লিমিটেড নামে একটি সাবসিডিয়ারি কোম্পানি করেছে। চীন ও আশপাশের এলাকা থেকে কাঁচামাল, পণ্য এবং খুচরা যন্ত্রাংশ আমদানি, আমদানীকৃত পণ্যের তাত্ক্ষণিক পরিদর্শন, ইস্পাত ও নির্মাণসামগ্রী রফতানি কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি এখন হংকংয়েই আরো ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে ইচ্ছুক হয়ে উঠেছে। এজন্য কোম্পানিটি ইআরকিউ হিসাব থেকে ৫ লাখ ডলার মূলধন বিনিয়োগের মাধ্যমে ব্যবসা সম্প্রসারণের অনুমতি চেয়েছে। বাংলাদেশী মুদ্রায় বিনিয়োগের পরিমাণ ৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএসআরএম গ্রুপের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন সেনগুপ্ত বলেন, প্রস্তাব অনুযায়ী বিনিয়োগের সুযোগ পেলে আমরা চায়না থেকে সস্তা দামে ইস্পাতের কাঁচামাল সংগ্রহ করতে পারব। এজন্য বিদেশে বিনিয়োগের লক্ষ্যে একটি আবেদন করা হয়েছিল। আমরা অনুমতির অপেক্ষায় আছি।

ব্যবসায় উচ্চপ্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রাখতে শুধু স্থানীয় বাজারের ওপর নির্ভরশীল থাকতে চাইছে না দেশের ওষুধ খাতের অন্যতম বৃহৎ প্রতিষ্ঠান রেনাটা লিমিটেড। এজন্য দেশের বাইরেও বাজার সম্প্রসারণের কৌশল হাতে নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এরই মধ্যে যুক্তরাজ্যে রেনাটা (ইউকে) লিমিটেড নামে একটি সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানও নিবন্ধিত হয়েছে। তবে এ সাবসিডিয়ারির শেয়ার মূলধন মাত্র ১ ব্রিটিশ পাউন্ড হওয়ায় এর মাধ্যমে ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ না থাকায় যুক্তরাজ্যে প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে পণ্য বাজারজাত করে। এতে করে তৃতীয় পক্ষকে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ কমিশন দিতে হয়। প্রস্তাবিত বিনিয়োগের মাধ্যমে রেনাটা (ইউকে) লিমিটেডের পক্ষে ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ এবং এলসি খোলার মাধ্যমে তাদের পণ্য যুক্তরাজ্যে সরাসরি বাজারজাত করতে পারবে। এজন্য কোম্পানিটি ইআরকিউ হিসাব থেকে ৫০ লাখ ডলার মূলধন বিনিয়োগের মাধ্যমে ব্যবসা সম্প্রসারণের অনুমতি চেয়েছে। বাংলাদেশী মুদ্রায় এ বিনিয়োগের পরিমাণ ৪৩ কোটি টাকা। এছাড়া কোম্পানিটি আয়ারল্যান্ডে রেনাটা ফার্মাসিউটিক্যালস (আয়ারল্যান্ড) লিমিটেড নামে একটি সাবসিডিয়ারি গঠনের অনুমতি চেয়েছে। এতে মূলধন হিসেবে বিনিয়োগ করা হবে ২০ লাখ ডলার। বাংলাদেশী মুদ্রায় এর পরিমাণ দাঁড়ায় ১৭ কোটি ২০ লাখ টাকা। এ বিনিয়োগের মাধ্যমে আয়ারল্যান্ডে রেনাটা ফার্মাসিউটিক্যালস (আয়ারল্যান্ড) লিমিটেড নামে একটি সাবসিডিয়ারি কোম্পানি গঠনের অনুমতি চেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

এদিকে এম অ্যান্ড জে গ্রুপের রফতানিমুখী তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান কলম্বিয়া গার্মেন্টস লিমিটেড হংকংয়ে এম অ্যান্ড জে (হংকং) লিমিটেড নামে একটি সাবসিডিয়ারি কোম্পানি স্থাপনে সে দেশে ইআরকিউ হিসাব থেকে ১৫ লাখ ডলার মূলধন বিনিয়োগের অনুমতি চেয়েছে। বাংলাদেশী মুদ্রায় বিনিয়োগের পরিমাণ ১২ কোটি ৯০ লাখ টাকা। প্রতিষ্ঠানটি দেশের বাইরে ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য এ সাবসিডিয়ারিটি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

এছাড়া মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের সোনারগাঁ সিড ক্রাশিং লিমিটেড তাদের ব্যবসায়ী কার্যক্রম সম্প্রসারণের জন্য সিঙ্গাপুরে একটি সাবসিডিয়ারি স্থাপন করতে চায়। এজন্য একই গ্রুপের তাসনিম কেমিক্যাল কমপ্লেক্স লিমিটেডের ইআরকিউ হিসাব থেকে ২৫ লাখ ডলার মূলধন বিনিয়োগের মাধ্যমে ব্যবসা সম্প্রসারণের অনুমতি চেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। বাংলাদেশী মুদ্রায় এ বিনিয়োগের পরিমাণ ২১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এদিকে বাংলাদেশ ভেঞ্চার ক্যাপিটাল লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান স্পেনে ওভারসিজ পোর্টফোলিও বিনিয়োগ হিসেবে ১০ হাজার ডলার বিনিয়োগ করার অনুমতি চেয়েছে। বাংলাদেশী মুদ্রায় বিনিয়োগের পরিমাণ ৮ লাখ ৬০ হাজার টাকা।

সম্পর্কিত খবর