রাজনৈতিক দলের পুরোনো চরিত্রে পরিবর্তন দরকার

সংস্কারের মাধ্যমে রাজনৈতিক দল থেকে পরিবারতন্ত্র বাদ দিয়ে গণতান্ত্রিক চর্চার তাগিদ দিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাটি বলেছে, আগস্ট অভ্যুত্থানের সুফল পেতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোর পুরোনো চরিত্রে পরিবর্তন দরকার। অন্যথায় সব প্রত্যাশা বিলীন হয়ে যাবে।

গতকাল বুধবার রাজধানীর ধানমন্ডির নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। এর আগে তিনি লিখিত বক্তব্যে রাষ্ট্র কাঠামো সংস্কারে ৯ দফা কৌশলগত সুপারিশ তুলে ধরেন। পরে খাতওয়ারি সুপারিশের কথাও জানান।

টিআইবির সুপারিশের মধ্যে রয়েছে– এক ব্যক্তি দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না। একই সময়ে একজন সংসদ নেতা, দলের প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না। সংসদের পাঁচ বছরের মেয়াদ পূরণের পর বাতিল হওয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আদলে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করে তাদের অধীনে জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করতে হবে। দলীয় প্রতীকে প্রদত্ত ভোটের আনুপাতিক হারে সংসদে প্রতিনিধিত্ব থাকবে। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে অনাস্থা প্রস্তাব এবং বাজেট ব্যতীত সব ক্ষেত্রে নিজ দলের বিপক্ষে ভোটের সুযোগ রাখতে হবে। বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করতে হবে। পরিবারতন্ত্র বাদ দিয়ে দলের অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক চর্চা করতে হবে। নির্বাহী বিভাগ থেকে প্রকৃত অর্থে বিচার বিভাগ স্বাধীন এবং সুপ্রিম কোর্টের অধীনে পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অনিয়ম-দুর্নীতি ও অর্থ পাচার রোধে দুদক, বিএফআইইউ, এনবিআর, সিআইডি ও অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসকে সম্পৃক্ত করে স্থায়ী টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে। জনপ্রতিনিধিত্ব, সরকার ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং চর্চায় এমন আমূল পরিবর্তন আনতে হবে, যেন জবাবদিহির মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালিত হয়।

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক সংসদ নির্বাচন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দলনিরপেক্ষ নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে হবে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান যে ম্যান্ডেট অন্তর্বর্তী সরকারকে দিয়েছে, সেই রাষ্ট্র কাঠামো পুনর্গঠনের লক্ষ্য অর্জনেই নির্বাচন হওয়া উচিত। নির্বাচনে রাজনৈতিক দলের মনোনয়নে কমপক্ষে এক-তৃতীয়াংশ তরুণ প্রতিনিধি রাখতে হবে।

তিনি বলেন, নজিরবিহীন প্রাণহানি ও ত্যাগের বিনিময়ে কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার হয়েছে। এখন স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক, দুর্নীতিমুক্ত, বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলার উপযোগী রাষ্ট্র কাঠামো তৈরির পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার ‘ডকট্রিন অব নেসেসিটির’ ওপর নির্ভর করে হয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন না হলে রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্য অর্জিত হবে না। ব্যক্তির পরিবর্তন বা শুধু প্রতিষ্ঠানের সংস্কার যথেষ্ট নয়।

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, মানুষের ভোটাধিকার খর্ব করার যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, তার পেছনে রাজনীতির মাঠে যারা ভূমিকা রেখেছেন, তাদের সবারই কমবেশি দায় আছে, তা ভুলে গেলে চলবে না। তারা যদি এ সংস্কৃতি থেকে সরে না আসে, আবারও যে কোনো মূল্যে ক্ষমতায় যেতে চায় এবং এটা আমাদের পালা– এমন মানসিকতার ওপর ক্ষমতার চর্চা ও তা আঁকড়ে থাকতে চাইলে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে।

তিনি আরও বলেন, ছাত্র-জনতা যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় বিচার চায়, মব জাস্টিস চায় না। বিচার প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হয়– এমন সব কার্যক্রম অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। সব সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিত এবং প্রতিষ্ঠানের প্রধান ও সদস্যদের নিয়োগে দলীয়করণ চিরস্থায়ীভাবে বন্ধ করতে হবে। বিদ্যমান দলীয় লেজুড়বৃত্তিক শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা, গণমাধ্যম, আইনসহ সব পেশাজীবী, বিশেষায়িত ও সেবা খাতভিত্তিক সংগঠন-সমিতি বিলুপ্ত করতে হবে। বিপরীতে দলীয় প্রভাবমুক্ত সংগঠন-সমিতি গড়ে তুলতে হবে।

এসব সুপারিশ ২৫ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ সব উপদেষ্টাকে পাঠানোর কথা সংবাদ সম্মেলনে জানায় টিআইবি। এ সময় উপস্থিত ছিলেন টিআইবির উপদেষ্টা-নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের, গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মুহাম্মদ বদিউজ্জামান, সিনিয়র রিসার্চ ফেলো শাহজাদা এম আকরাম, মো. জুলকারনাইন, আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম প্রমুখ।

এন এস

সম্পর্কিত খবর