ব্যাংক আমানতের প্রবৃদ্ধি কমেছে ৫১%

কভিডের প্রাদুর্ভাবে স্থবির হয়ে পড়েছিল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। তার পরও ২০২০ সালজুড়ে দেশের ব্যাংক খাতে আমানতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে রেকর্ড মাত্রায়। এর প্রভাব পড়েছিল ব্যাংকগুলোর তারল্য ব্যবস্থাপনায়। মেয়াদি আমানতের সুদহার নেমে এসেছিল ইতিহাসের সর্বনিম্নে। তবে এক বছরের মধ্যেই পুরোপুরি ঘুরে গিয়েছে পরিস্থিতি। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফিরলেও থমকে দাঁড়িয়েছে দেশের ব্যাংক খাতের আমানতের প্রবৃদ্ধি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২০ সালের জুলাই-নভেম্বর সময়ে ব্যাংক খাতে আমানত বেড়েছিল ৮৬ হাজার ৯০২ কোটি টাকা। ওই সময় আমানতের প্রবৃদ্ধি ছিল ৫৮ শতাংশেরও বেশি। কিন্তু ২০২১ সালের একই সময়ে আমানত বৃদ্ধির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪২ হাজার ৩০৯ কোটি টাকায়। সে হিসাবে এ সময়ের মধ্যে ব্যাংক খাতে আমানতের প্রবৃদ্ধির পরিমাণ কমেছে ৫১ শতাংশ। ২০২০ সালের জুলাই-নভেম্বর সময়ে ব্যাংকগুলোয় মেয়াদি আমানতের প্রবৃদ্ধির পরিমাণ বেড়েছে ৩৯ শতাংশ। কিন্তু গত বছরের একই সময়ে মেয়াদি আমানতের প্রবৃদ্ধি কমেছে ৪১ শতাংশ।

স্থবিরতার কালে আমানতের রেকর্ড প্রবৃদ্ধি আর অর্থনৈতিক প্রাণচাঞ্চল্যের সময়ে তা থমকে যাওয়াকে পরস্পরবিরোধী হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, রেমিট্যান্সের রেকর্ড প্রবৃদ্ধিসহ নানা কারণে ২০২০ সালে ব্যাংক খাতে আমানতের উল্লম্ফন হয়েছিল। কিন্তু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ফেরার মুহূর্তে আমানতের প্রবৃদ্ধি থমকে যাওয়ার বিষয়টি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ প্রবৃদ্ধি থমকে যাওয়ার পেছনে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাওয়াসহ বেশকিছু কারণ থাকতে পারে। তবে দেশ থেকে অর্থ পাচার বেড়ে গিয়েছে কিনা, সেটি খুঁজে দেখা দরকার।

নির্ভরযোগ্য একটি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দেশের বড় ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি মাঝারি মাপের ব্যবসায়ীরাও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছেন। এর মধ্যে দুবাই হয়ে উঠেছে বাংলাদেশী ব্যবসায়ীদের বাণিজ্যের বড় কেন্দ্র। দেশের বড় ব্যবসায়ীদের অনেকেই দুবাইয়ে ব্যবসায়িক দপ্তর খুলছেন। সেখানে হোটেল, পর্যটনসহ বিভিন্ন খাতে বড় অংকের বিনিয়োগ করছেন তারা। আবার মাঝারি ও ছোট ব্যবসায়ীরাও দুবাইয়ে দোকান ও পণ্যের শোরুম খুলছেন। সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রচ্যের অন্য দেশগুলোয়ও বাংলাদেশীদের ব্যবসায়িক পরিধি বড় হচ্ছে। আমদানি-রফতানি পণ্যের আড়ালে দেশ থেকে বড় ব্যবসায়ীদের টাকা পাচার বাড়ছে। আর মাঝারি ও ছোট ব্যবসায়ীরা হুন্ডির মাধ্যমে দেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে টাকা পাচার করছেন।

সম্প্রতি দেশে খুচরা বাজারে (কার্ব মার্কেট) ডলারের দাম ৯২ টাকায় গিয়ে ঠেকে। অথচ ব্যাংক খাতে প্রতি ডলার বিনিময় হচ্ছে ৮৬ টাকায়। ব্যাংক খাতের সঙ্গে খুচরা বাজারে ডলারের দামের বড় ধরনের তারতম্যের পেছনে দেশ থেকে অর্থ পাচারের যোগসূত্র রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

আমানতের উচ্চপ্রবৃদ্ধি থেমে যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, চলতি অর্থবছরে রেমিট্যান্স প্রবাহ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কমেছে। সরকার বিল-বন্ডের মাধ্যমে ব্যাংক খাত থেকে ঋণ গ্রহণের প্রবণতা বাড়িয়েছে। ডলারের তীব্র চাহিদা মেটাতে অর্থবছরের প্রথমার্ধেই ব্যাংকগুলোর কাছে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর মাধ্যমে বাজার থেকে সমপরিমাণ টাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংক তুলেও নিয়েছে। এসব কারণে আমানতের প্রবৃদ্ধি কমতে পারে। তবে এর বাইরে অন্য কোনো কারণও বড় ভূমিকা রেখেছে কি না, সেটি খতিয়ে দেখা দরকার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২১ সালের নভেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতে মেয়াদি ও তলবি আমানতের পরিমাণ ছিল ১৩ লাখ ৯৩ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১২ লাখ ৩৩ হাজার ৫৮২ কোটি টাকা ছিল মেয়াদি আমানত। আর তলবি আমানত ছিল ১ লাখ ৬০ হাজার ১০৪ কোটি টাকা। ২০২০ সালের জুলাই-নভেম্বর মেয়াদে ব্যাংকগুলোর মেয়াদি আমানতের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩৯ শতাংশেরও বেশি। আর ২০২১ সালের একই সময়ে মেয়াদি আমানতের এ প্রবৃদ্ধি ৪১ দশমিক ১৩ শতাংশ কমেছে। গত নভেম্বর পর্যন্ত দেশের ব্যাংকগুলোর হাতে বিনিয়োগযোগ্য অতিরিক্ত তারল্য ছিল ২ লাখ ১৮ হাজার ১১৮ কোটি টাকা।

আমানতের বড় উল্লম্ফন হওয়ায় গত বছরের মাঝামাঝিতে ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত তারল্য আড়াই লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। অলস তারল্যের চাপ সামলাতে ওই সময় মেয়াদি আমানতের সুদহার ইতিহাসের সর্বনিম্নে নামিয়ে আনে ব্যাংকগুলো। ওই সময় কোনো কোনো ব্যাংক তিন থেকে ছয় মাস মেয়াদি আমানতের সুদহার ৩ শতাংশে নামিয়ে আনে। এ পরিস্থিতিতে আমানতের সুদহারে হস্তক্ষেপ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত বছরের আগস্টে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মেয়াদি আমানতের সুদহার দেশের মূল্যস্ফীতির নিচে হবে না বলে প্রজ্ঞাপন জারি করে। প্রজ্ঞাপনটি জারি হওয়ার পর ব্যাংকগুলো আমানতের সুদহার বাড়াতে বাধ্য হয়। সুদহার বাড়ানোর পরও ব্যাংক খাতের আমানতের প্রবৃদ্ধি থমকে গিয়েছে।

ব্যাংক এশিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আরফান আলী মনে করেন, ২০২০ সালে বিনিয়োগ অনিশ্চয়তার কারণে দেশের করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর আমানত ব্যাংকে জমা ছিল। কিন্তু ২০২১ সালে করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসায় করপোরেটগুলো বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণে মনোযোগী হয়েছে। আবার মহামারী সৃষ্ট স্থবিরতার কারণে ২০২০ সালে সাধারণ মানুষের পারিবারিক ব্যয় কমে গিয়েছিল। যেটি পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে। হাউজহোল্ডের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় উচ্চ ও মধ্যবিত্তের ব্যাংকের সঞ্চয় কমেছে।

গত বছরের মাঝামাঝি থেকে দেশের পুঁজিবাজারে বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা দেয়। ২০২০ সালে প্রতিদিন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) গড় লেনদেন ছিল ৬৪৮ কোটি টাকা। কিন্তু ২০২১ সালে দিনে গড় লেনদেন হয়েছে ১ হাজার ৪৭৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে গত বছরের আগস্টে ডিএসইতে লেনদেন ২ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। ১৬ আগস্ট পুঁজিবাজারের লেনদেন হয় ২ হাজার ৯৫৩ কোটি টাকা।

ব্যাংক খাতে আমানতের সুদহার কমে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের একটি অংশ পুঁজিবাজারমুখী হয়। অনেকে মেয়াদি আমানত তুলে নিয়ে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে। এ কারণেও দেশের ব্যাংক খাতে আমানতের প্রবৃদ্ধি কমেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। তবে আগের অর্থবছরের তুলনায় চলতি অর্থবছরে সরকারের সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে ভাটা পড়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে সরকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি করেছিল ৪১ হাজার ৯৫৯ কোটি টাকা। কিন্তু চলতি অর্থবছরের নভেম্বর পর্যন্ত পাঁচ মাসে মাত্র ১০ হাজার ২৫ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি করতে পেরেছে সরকার। সঞ্চয়পত্র বিক্রি কম হওয়ায় সাধারণ মানুষের সঞ্চয় ব্যাংক খাতে যাওয়ার কথা। কিন্তু তার প্রতিফলন ব্যাংক আমানতের প্রবৃদ্ধিতে দেখা যাচ্ছে না।