বেসরকারি খাতের উত্থান পর্বে অংশীদার ছিলেন সাবেক সামরিক কর্মকর্তারাও

যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশ। সমাজতান্ত্রিক ও পরিকল্পিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে যাত্রা শুরু। জাতীয়করণ করা হয় দেশের সব শিল্প-কারখানা। এ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থেকে এক দশকের মধ্যেই বাংলাদেশ সরে আসতে শুরু করে। আশির দশকের শুরুতে রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প-কারখানা বড় মাত্রায় বেসরকারীকরণ শুরু হয়। বেসরকারি খাতও আস্তে আস্তে বিস্তৃত হতে থাকে। ব্যক্তি খাত বিকাশে এ প্রারম্ভিক পর্যায়ে সামরিক বাহিনীর চাকরি ছেড়ে সে সময় অনেক কর্মকর্তাই ব্যক্তি খাতে উদ্যোগ নেয়া শুরু করেন। এদের অনেকেই পরবর্তী সময়ে বিগত শতকের শেষ দিকে ও এই শতকের প্রারম্ভে বেসরকারি খাতের মধ্যমণি হয়ে ওঠেন।

উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী সমাজ মনে করে, অনেকেই সামরিক চাকরি ছেড়ে উদ্যোক্তা হওয়ার চেষ্টা করলেও সবাই সফল হননি। আবার অনেকেই বড় হওয়ার পরও ব্যবসা ধরে রাখতে পারেননি। কারো কারো ইতি ঘটেছে বড় রকমের বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে। বেসরকারি খাতে বড় অবস্থান তৈরি করতে পেরেছিলেন যারা তাদের মধ্যে প্রয়াত আমজাদ খান চৌধুরী, আনিসুর রহমান সিনহা, কাজী শাহেদ আহমেদ, আব্দুল মান্নান এমপি অন্যতম।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন বলেন, বেসরকারি খাতের উত্থান ও বিকাশে অনেকে ভূমিকা রেখেছেন। এদের মধ্যে সাবেক সামরিক কর্মকর্তারাও ছিলেন। জাতীয় নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ কর্মজীবন শেষে তাদের অনেকেই উদ্যোক্তা হিসেবে নাম লিখিয়েছিলেন। কেউ কেউ অনেক সফলতা পেয়েছেন। বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায় প্রাণের কথা। প্রতিষ্ঠানটি অনেক ভালো অবস্থান তৈরি করেছে। লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান করেছে গ্রুপটি। এখন নাজুক পরিস্থিতিতে পড়লেও ভালো অবস্থান তৈরি করেছিলেন আনিসুর রহমান সিনহা। এ রকম আরো অনেকেই আছেন যারা দেশের বেসরকারি খাতের উত্থানে বড় ভূমিকা রেখেছেন।

দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় কনগ্লোমারেট প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা মেজর জেনারেল (অব.) আমজাদ খান চৌধুরী। কৃষি প্রক্রিয়াকরণ শিল্পে গ্রুপটির অবস্থান শীর্ষে। আমজাদ খান চৌধুরীর জন্ম ১৯৪০ সালে নাটোরে। ১৯৫৬ সালে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৮১ সালে সামরিক বাহিনী থেকে অবসর নেয়ার পর পেনশনের টাকায় একই বছর রংপুরে শুরু করেন ফাউন্ড্রি বা টিউবওয়েল তৈরির কারখানা। পাশাপাশি আবাসন ব্যবসাও। ১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠা করেন এগ্রিকালচারাল মার্কেটিং কোম্পানি লিমিটেড প্রাণ। দেশের প্রায় সব জেলায়ই পদচারণা রয়েছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের। পরবর্তী সময়ে তা দেশের সীমানাও ছাড়িয়েছে। ১৯৯৭ সালে ফ্রান্সে আনারস রফতানি দিয়ে শুরু। প্রাণের পণ্য এখন বিশ্বের ১৪০টিরও বেশি দেশে রফতানি হচ্ছে। ২০১৫ সালে আমজাদ খান চৌধুরীর প্রয়াণের পর তার ছেলে আহসান খান চৌধুরী ব্যবসা সামলাচ্ছেন। গ্রুপটির বার্ষিক আয় বছর দুই আগেই ১৪ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।

পিতার প্রয়াণের পর ব্যবসা পরিচালনার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল এমন প্রশ্নের জবাবে আহসান খান চৌধুরী জানিয়েছিলেন, আমার বাবার অনেক গুণের মধ্যে একটি ছিল তিনি অর্গানাইজেশন খুব ভালো বুঝতেন। ব্যক্তি থেকে করপোরেট পরিচালিত ব্যবসায় বেশি নজর দিতেন তিনি। আমাদের ব্যবসাটা কখনই একজন খেলোয়াড়কেন্দ্রিক হিসেবে গড়ে ওঠেনি। তিনি সামরিক বাহিনীর মানুষ ছিলেন। সামরিক বাহিনীতে একজন মানুষ যুদ্ধ জয় করতে পারে না। সবাই মিলে সামগ্রিকভাবে যুদ্ধ জয় করতে হয়। তাই বাবার কাছ থেকে আমরা টিমওয়ার্ক বা দলগতভাবে কাজ করাটা রপ্ত করতে পেরেছি।

জেমকন গ্রুপের চেয়ারম্যান কাজী শাহেদ আহমেদের জন্ম ১৯৪০ সালে, যশোরে। প্রকৌশলী হিসেবে শিক্ষাজীবন শেষে ১৪ বছর সেনাবাহিনীতে কাজ করেছেন। তিনি বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির (বিএমএ) প্রতিষ্ঠাকালীন প্লাটুন কমান্ডারদের একজন। ১৯৭৯ সালে ‘জেমকন গ্রুপ’ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তার ব্যবসায়ী জীবন শুরু। বাংলাদেশে প্রথম অর্গানিক চা বাগানের প্রতিষ্ঠাতা তিনি। তার প্রতিষ্ঠিত কাজী টি দেশের চায়ের বাজারের সুপরিচিত ব্র্যান্ড। দেশে সুপারস্টোর ব্যবসায়ও তিনি অন্যতম পথিকৃৎ। জেমকন গ্রুপের সুপারস্টোর মীনা বাজার নামে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এছাড়া তিনি আবাসন, নির্মাণ, প্রকৌশল, তার, পাট, সি ফুড, মিষ্টি ও অর্গানিক হারবাল পণ্যের ব্যবসায়ও বিনিয়োগ করেছেন। তিনি খবরের কাগজ ও আজকের কাগজের প্রকাশক ও সম্পাদক। তার অন্যান্য উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ ও কাজী শাহেদ ফাউন্ডেশন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নব্বইয়ের দশকে গোটা বিশ্বজুড়ে মুক্তবাজার অর্থনীতির চর্চা শুরু হয়। যার ছাপ পড়েছিল বাংলাদেশেও। এর ধারাবাহিকতায় অনেক সেনা কর্মকর্তাই উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। দেশ গড়ার পাশাপাশি ব্যক্তি খাতের বিকাশেও ভূমিকা রাখার সুযোগ গ্রহণ করেছিলেন তারা। এদের মধ্যে যাদের প্রকৃত উদ্যোক্তা গুণ ছিল তারা স্বপ্নকে সফলভাবে বাস্তবায়ন করেছেন।

দেশের সবচেয়ে বড় শ্রমঘন খাত পোশাক শিল্প। এ শিল্পের গোড়াপত্তন হয় সত্তরের দশকের শেষে। আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে শিল্পটি বিকাশে সহায়ক নীতি প্রণয়ন করে সরকার। ওই দশকেই রফতানিমুখী শিল্পোদ্যোক্তা গড়ে উঠতে শুরু করে। এ শিল্পটিকে যারা বড় রূপ দেয়ার চেষ্টা করে সফল হয়েছেন এমন একজন হলেন আনিসুর রহমান সিনহা। বস্ত্র ও পোশাক পণ্য তৈরিতে বিনিয়োগের মাধ্যমে আশির দশকের শুরুতে যাত্রা করে আনিসুর রহমান সিনহার প্রতিষ্ঠান ওপেক্স অ্যান্ড সিনহা টেক্সটাইল গ্রুপ।

ঢাকা থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে কাঁচপুরে বড় কারখানা কমপ্লেক্স গড়ে তোলে গ্রুপটি। ৪৩ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা শিল্পোদ্যোগটি বস্ত্র ও পোশাক খাতে এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ উৎপাদনক্ষেত্র হিসেবেও স্বীকৃতি পেয়েছে। প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছিল প্রায় অর্ধলক্ষ মানুষের। আশির দশকে যাত্রা শুরু করলেও নব্বইয়ের দশকেই পোশাক খাতে বড় ভূমিকা ছিল আনিসুর রহমান সিনহার। এ ধারা অব্যাহত ছিল ২০১৩ সাল পর্যন্ত।

সানম্যান গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা মেজর (অব.) আবদুল মান্নানের জন্ম ১৯৪২ সালে নোয়াখালীতে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা আবদুল মান্নানে ১৯৬২ সালে সামরিক শিক্ষালয় স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের পর ১৯৭৪ সালে তিনি সামরিক বাহিনী থেকে অবসর নেন। যাদের হাত ধরে দেশে তৈরি পোশাক খাতের যাত্রা হয়েছিল তাদের অন্যতম মেজর (অব.) আবদুল মান্নান। সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেয়ার পর তিনি আজিম মান্নান গার্মেন্টস নামে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন, বর্তমানে যা সানম্যান গ্রুপ নামে পরিচিত। বাংলাদেশে ওয়াইম্যাক্স প্রযুক্তির ইন্টারনেট সেবায়ও তিনি ছিলেন পথিকৃৎ।

বস্ত্র, ওষুধ, এভিয়েশন, ফিশিং, শিপিং, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বীমা, কোমল পানীয়, সিএনজি, রিয়েল এস্টেট ও টেলিযোগাযোগ খাতে ব্যবসা সম্প্রসারণ করেছিলেন আবদুল মান্নান। এমনকি দেশের বাইরে কম্বোডিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রেও ব্যবসায়িক কার্যালয় খোলেন। মেজর (অব.) আবদুল মান্নানের প্রতিষ্ঠিত সানম্যান গ্রুপ অব কোম্পানিজের আওতাধীন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৪৮। একসময় দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত ছিল এটি। যদিও সানম্যান গ্রুপের বেশির ভাগ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানই এখন দুরবস্থায় রয়েছে।

এইচএস এন্টারপ্রাইজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক লে. কর্নেল (অব.) এএস হেলাল উদ্দিনের জন্ম ১৯৪৮ সালে ঢাকা জেলার দোহারে। ১৯৬৭ সালে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। এর দুই বছর পর তিনি সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে কমিশন লাভ করেন। ১৯৭১ সালে ক্যাপ্টেন হিসেবে কর্মরত থাকা অবস্থায় তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। ১৯৮১ সালে লে. কর্নেল হিসেবে অবসর নেন তিনি। অবসরের পর পেনশনের টাকায় তিনি ঢাকা-জয়দেবপুর সড়কে পরিবহন ব্যবসা শুরু করেন। দেশে এমা ব্র্যান্ডের গাড়ি বিপণন শুরু তার হাত ধরেই। ১৯৮১ সালে তার প্রতিষ্ঠিত এইচএস এন্টারপ্রাইজ দেশে হোন্ডা মোটরের ডিস্ট্রিবিউটর হিসেবে কাজ করছে। দেশের অটোমেটিভ ও পাওয়ার প্রডাক্টস খাতের অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবেও পরিচিতি রয়েছে তার।

মত্স্য খাতের ব্যবসায় সংশ্লিষ্ট ছিলেন সামরিক বাহিনীর আরেক সাবেক কর্মকর্তা মেজর (অব.) মো. আখতারুজ্জামান। তার প্রতিষ্ঠান পুঁজিবাজার থেকে তালিকাচ্যুত কোম্পানি গচিহাটা অ্যাকুয়াকালচার ফার্মস লিমিটেড বর্তমানে ব্যবসায়িকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে।

সূত্র জানিয়েছে, দেশের আবাসন খাতের ব্যবসায়ও যুক্ত ছিলেন সাবেক সামরিক কর্মকর্তাদের অনেকেই। তাদের একজন মনজুর কাদের। পোশাক খাতের ব্যবসায় যুক্ত ছিলেন কর্নেল আজিম। নৌবাহিনীর সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে মত্স্য আহরণের ব্যবসায় যুক্ত হয়েছিলেন কেউ কেউ। এমন একজন হলেন এম এইচ খান। আবার নব্বইয়ের দশকে বেসরকারি নিরাপত্তা সেবার ব্যবসায়ও যুক্ত হয়েছিলেন অনেকে। তাদের অন্যতম সিকিউরেক্সের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত গ্রুপ ক্যাপ্টেন তাহের কুদ্দুস ও এলিট ফোর্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শরীফ আজিজ।

জানতে চাইলে শরীফ আজিজ বলেন, বাংলাদেশ স্বাধীনতার ৫০ বছরে পদার্পণ করেছে। এই সময়ে বেসরকারি খাত অনেক বড় অবদান রেখেছে এটা দৃশ্যমান। কিন্তু এগুলো কোনো কিছুই সম্ভব হতো না, যদি সরকারি সহায়তা নিশ্চিতের পাশাপাশি অবকাঠামো গড়ে না উঠত। সড়ক অবকাঠামো থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ-গ্যাসের মতো ভৌত অবকাঠামোগুলো বেসরকারি খাতকে এগিয়ে যেতে সহায়তা করেছে। সরকারের সহযোগিতা কাজে লাগিয়ে বেসরকারি নিরাপত্তা খাতেই ভূমিকা রেখেছেন, এমন একজন হলেন মেজর তালেবুল মওলা। এছাড়া আরো বেশ কয়েকজনের ব্যক্তি উদ্যোগেই বর্তমানে সাত-আট লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে বেসরকারি নিরাপত্তা সেবা খাতে।

বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, অনেকেই আছেন যারা অন্য পেশা থেকে এসে ব্যবসা-বাণিজ্য-শিল্পে ভূমিকা রেখেছেন। নব্বইয়ের দশকে উদ্যোক্তা হিসেবে সফলভাবে বড় ভেঞ্চার শুরু করেছিলেন এমন ব্যক্তিদের মধ্যে কিছু সাবেক সেনা কর্মকর্তাও ছিলেন। যদিও এদের অনেকেই নব্বইয়ের দশকের আগে থেকেই উদ্যোক্তা হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিলেন। একটা পর্যায়ে বড় কনগ্লোমারেটে রূপ নিয়েছে সেই প্রতিষ্ঠানগুলো। ব্যবসা-বাণিজ্য-শিল্পে এসব উদ্যোক্তার অংশগ্রহণ অনেক সাধারণ উদ্যোক্তাকেও সাহস জুগিয়েছিল।

 

সম্পর্কিত খবর