এবার টাকা বন্ডের ব্যবসায় আইএফসি

টাকা বন্ড ছেড়ে আর্থিক খাতের ব্যবসায় যুক্ত হতে চায় আইএফসি। এতে দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসা সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন অনেকেই।

লন্ডনে ‘বাংলা বন্ড’ ছাড়ার পর এবার দেশে ‘টাকা বন্ড’ ছাড়ার উদ্যোগ নিয়েছে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি)। বন্ড ছেড়ে টাকা তুলে দেশের বিভিন্ন শিল্পে বিনিয়োগের লক্ষ্য সংস্থাটির।

দেশের শেয়ারবাজারে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে এই বন্ডের টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা করছে আইএফসি। এর ফলে শেয়ারবাজারে বন্ড মার্কেটের উন্নয়ন ঘটবে বলে মনে করে আইএফসি।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) ১৭ অক্টোবর আইএফসিকে এই টাকা বন্ড ছাড়ার প্রাথমিক সম্মতি দিয়েছে। ইআরডি জানিয়েছে, আইএফসি টাকা বন্ড ছাড়লে তা ব্যবসা হিসেবেই গণ্য হবে। এ জন্য অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মতো যথাযথ কর দিতে হবে।

এখন বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) অনুমোদন দিলে আইএফসির টাকা বন্ড চূড়ান্ত রূপ পাবে। সে জন্য এই দুটি নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে এখন আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রতিষ্ঠানটি। গত রোববারও আইএফসির একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল এ নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে সভা করেছে। পাশাপাশি সফরকারী প্রতিনিধিদলটি সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।

আইএফসি এত দিন বিদেশ থেকে তহবিল এনে বেসরকারি খাতে অর্থায়ন ও বিনিয়োগ করে আসছিল। এখন দেশের অন্যান্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মতো ব্যবসায় যুক্ত হতে চাইছে। এতে দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসা সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন অনেকেই।

এ নিয়ে আইএফসির বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটানের ভারপ্রাপ্ত দেশীয় ব্যবস্থাপক নুঝহাত আনোয়ারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ‘টাকা বন্ড’ ছাড়ার উদ্যোগের বিষয়টি স্বীকার করেন। তবে চূড়ান্ত অনুমোদন না হওয়ায় এখনই এ নিয়ে বিস্তারিত বলতে চাননি।

জানা গেছে, বন্ড ছেড়ে ঠিক কত টাকা তোলা হবে, তা আইএফসি এখনো ঠিক করেনি। টাকা তুলতে বিনিয়োগকারীদের কত কুপন রেট দেওয়া হবে ও কত সুদে অর্থায়ন করবে, তা-ও ঠিক করা হয়নি।

২০১৯ সালের শেষের দিকে লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জে (এলএসই) প্রথমবারের মতো তালিকাভুক্ত হয় ‘বাংলা বন্ড’, যার মাধ্যমে ১ কোটি ৯৫ লাখ হাজার ডলার সংগ্রহ করা হয়, যা তখন বাংলাদেশি মুদ্রায় ১৬০ কোটি টাকার সমান ছিল। সব মিলিয়ে বাংলা বন্ডের মাধ্যমে আরও কয়েক ধাপে অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনার কথা জানানো হয়, যদিও শেষ পর্যন্ত তা আর হয়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, বাংলা বন্ডের নামে আইএফসি প্রথমে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ সুদে ৯৫ লাখ ডলার ও পরে ৭ দশমিক ১০ শতাংশ সুদে ১ কোটি ডলার সংগ্রহ করে। ব্যাংক অব আমেরিকা ও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের মাধ্যমে বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা এই বন্ডে বিনিয়োগ করেছে। বন্ডটির সুবিধা ছিল দেশীয় মুদ্রায় আসল ও সুদ পরিশোধ করা।

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ সূত্রে জানা গেছে, আইএফসির বাংলা বন্ড থেকে তাদের দুটি কোম্পানি ১৬০ কোটি টাকা ঋণ পেয়েছিল। এর মধ্যে প্রাণ অ্যাগ্রো লিমিটেড ৮০ কোটি ও নাটোর অ্যাগ্রো লিমিটেড ৮০ কোটি টাকা ঋণ পায়। দুটি কোম্পানি ৮০ কোটি টাকা ঋণ পেয়েছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ সুদে, যার মেয়াদ শেষ হবে ২০২২ সালের জুলাইয়ে। কোম্পানি দুটি বাকি ৮০ কোটি টাকার ঋণ পেয়েছিল ১১ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ সুদে, যার মেয়াদ শেষ হবে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে। অর্থাৎ বর্তমান ব্যাংকের সুদহারের চেয়ে বেশি সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে প্রাণ-আরএফএলকে। তবে গ্রুপটি এ নিয়ে উদ্বিগ্ন নয়। কারণ, বন্ডের মাধ্যমে পাঁচ-ছয় বছর মেয়াদি অর্থায়ন পাচ্ছে।

এ নিয়ে যোগাযোগ করা হলে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক (করপোরেট ফাইন্যান্স) উজমা চৌধুরী এক লিখিত বক্তব্যে বলেন, ‘বর্তমানে সরকারি ব্যাংকে সুদ ৯ শতাংশ। কিছু ব্যাংকে সুদের হার আরও কম। কিন্তু মেয়াদ ৬ থেকে ৯ মাস। আমাদের প্রয়োজন বেশি মেয়াদি ঋণ। যখন আমরা ১০ শতাংশ সুদে ঋণ পাচ্ছিলাম, তখন বন্ডের সুদহার ছিল গড়ে ১০ শতাংশ। আগামী বছরে ঋণের সুদ বাড়তে পারে, কিন্তু তখনো বন্ডের সুদের হার একই থাকবে।’