ডলার সংকটে বেশি বিপাকে ছোট ব্যবসায়ীরা
দুই বছর ধরে দেশের ব্যাংক ও খোলাবাজারে টাকার বিপরীতে মার্কিন ডলারের দাম বেড়েই চলেছে। দেশের মুদ্রাবাজার নিয়ন্ত্রণে একাধিক পদক্ষেপও নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর পরও নিয়ন্ত্রণে আসছে না ডলারের দাম। চলমান সংকটে বেশি বিপাকে পড়েছেন ছোট ব্যবসায়ীরা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাজারভিত্তিক ডলার ব্যবস্থাপনা যথাযথ না হলে এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পথ বাড়ানো না গেলে শিগগিরই এই সংকটের সমাধান হবে না। এ ক্ষেত্রে রপ্তানি ও রেমিট্যান্স বৃদ্ধির বিকল্প নেই বলে মনে করছেন তাঁরা।
বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের কারণে ২০২২ সালের মার্চ থেকে ব্যাপক হারে দেশে মার্কিন ডলারের মূল্য বাড়তে শুরু করে। ২০২২ সালের ৩০ মার্চ ডলারের অফিশিয়াল দাম ছিল ৮৬.২০ টাকা।
সেখান থেকে বেড়ে এখন ১১৭ টাকায় উঠেছে। ২৫ মাসের ব্যবধানে ডলারের দাম বেড়েছে ৩৭.৬৪ শতাংশ। তবে ব্যাংকগুলো আমদানি দায় মেটাতে ডলারের দাম ১২০ টাকার বেশি নিচ্ছে বলে জানা গেছে। কারণ ব্যাংকগুলো ঘোষণার চেয়ে বেশি দামে প্রবাস আয় বা রেমিট্যান্স কিনছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থনৈতিক উপদেষ্টা মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘সংকট সমাধানের জন্য বাংলাদেশে যেসব পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে, এতে শিগগিরই এই ডলার সমস্যার সমাধান হবে না, যদি আমরা রেমিট্যান্স ও এক্সপোর্ট গ্রোথ বাড়াতে না পারি। পাশাপাশি মাল্টিল্যাটারাল অ্যাসিস্ট্যান্স যাতে পাওয়া যায়, তার ব্যবস্থা করতে হবে। এর জন্য উন্নয়ন প্রকল্পগুলো সময়মতো বাস্তবায়নের শর্ত রয়েছে, যেগুলো সময়সাপেক্ষ ব্যাপার।’
বাংলাদেশ ব্যাংক গত ৮ মে ডলারের দাম ও ঋণের সুদের ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আনে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফের ঋণের শর্ত পালনের অংশ হিসেবে ডলারের দাম ১১০ থেকে একলাফে সাত টাকা বাড়িয়ে ১১৭ টাকা করা হয়েছে।
এতে সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাণিজ্যিক ব্যাংক ও খোলাবাজারে। এলসি খোলার কিছু ক্ষেত্রে ১২০ টাকা এবং খোলাবাজারে প্রতি ডলারের দাম ১২৫ টাকা ছাড়িয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্পের উদ্যোক্তারা।
ডলার সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত মাঝারি উদ্যোক্তা শাবাব লেদারের মালিক মাকসুদা খাতুন বলেন, ‘গত আট বছরের সবচেয়ে খারাপ সময় ছিল ২০২৩ সাল। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ, ডলার সংকট, মূল্যস্ফীতিসহ নানা কারণে আমাদের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আশা করছি, ২০২৪ সালটা যেন ভালো কাটে। তা না হলে আমরা আরো ক্ষতির সম্মুখীন হব।’
মাকসুদা খাতুন বলেন, ‘প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে আমার মতো অনেক উদ্যোক্তাকে ডলার সংকটের মুখোমুখি হতে হয়। একাধিক ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করেও ডলারের ব্যবস্থা করা যায় না। যেসব বড় ব্যবসায়ীর সঙ্গে ব্যাংকের সম্পর্ক ভালো, তারাই ডলার পায় এবং এলসি করতে পারে। এতে ছোট রপ্তানিকারকদের বায়াররা আগ্রহ হারান। কারণ আমরা বায়ারদের চাহিদামতো পণ্য সরবরাহ করতে পারি না। এ বছর (২০২৪) আমরা নতুন করে চিন্তা-ভাবনা করছি। আশা করছি, বায়াররাও বিশ্বব্যাপী সংকটের বিষয় বুঝতে পেরেছেন।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রার আগমনের চেয়ে বহির্গমন বেশি। এটা যত দিন না বাড়বে, তত দিন সংকট কাটবে না। ডলারের বহির্গমন ঠেকাতে বড় বড় এলসি তদারকি এবং কিছু বিলাসী পণ্য আমদানিতে শর্ত আরোপ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু এভাবে কত দিন চলবে? দেশের প্রয়োজনেই একটা সময় এই শর্ত তুলে দিতে হবে। কারণ বিদেশ থেকে ফ্যাক্টরির মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি না করলে দেশের উৎপাদন ব্যাহত হবে। কর্মসংস্থান কমে যাবে। তাই আমদানিতে আরোপ করা এই সীমা একটা সময় উঠিয়ে দিতে হবে।
ডলার সমস্যার কারণ
রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্স কমে যাওয়ার কারণে ডলার সমস্যা তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন সালেহউদ্দিন আহমেদ। এই সমস্যার সমাধান করতে হলে রপ্তানি ও রেমিট্যান্স বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। রেমিট্যান্সে ২ থেকে ২.৫ শতাংশ প্রণোদনা দিয়ে কোনো কাজ হবে না। বিকল্প কিছু ভাবতে হবে। যেমন—রপ্তানি বহুমুখীকরণ। আমাদের দেশের রপ্তানি খাত শুধু একটি পণ্যের (তৈরি পোশাক) ওপর নির্ভরশীল। তৈরি পোশাকের মতো অন্যান্য খাতেও প্রণোদনা দিয়ে রপ্তানিতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। পাশাপাশি ইউরোপ ও আমেরিকার বাইরেও রপ্তানি বাজার তৈরি করা খুবই জরুরি।
ডলার সংকটের প্রভাব
ডলার সংকটের কারণে প্রয়োজনীয় পণ্য বিদেশ থেকে আমদানি করা যাচ্ছে না। এতে বেড়ে যাচ্ছে আমদানিনির্ভর পণ্যমূল্য, যা সরাসরি প্রভাব ফেলছে দেশের মূল্যস্ফীতিতে। ব্যাহত হচ্ছে বিদেশি ঋণ পরিশোধ প্রক্রিয়া। একই সঙ্গে ডলার সংকটের কারণে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর তারল্য ব্যবস্থাপনা দুর্বল হচ্ছে।
তিন বছর ধরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ধারাবাহিকভাবে রিজার্ভ থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকের কাছে ডলার বিক্রি করেছে। গত বছরের জুলাই থেকে চলতি অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত ডলার বিক্রির পরিমাণ ১০ বিলিয়ন ছাড়িয়েছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে যা ছিল ১৩.৫৮ বিলিয়ন। প্রাথমিকভাবে খাদ্য, জ্বালানি, সারসহ পাঁচ-ছয় ধরনের পণ্যের আমদানি বিল মেটানোর জন্য এই ডলার বিক্রি করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
গত ১৭ জানুয়ারি নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণার সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আবদুর রউফ তালুকদার বলেন, ব্যাংকে তারল্য সংকটের মূল কারণ ডলারের ঘাটতি। বাংলাদেশ ব্যাংক গত তিন বছরে ব্যাংকগুলোর কাছে ২৮.৭ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করেছে, যার মাধ্যমে দুই লাখ ৮৪ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে। কিন্তু একই পরিমাণ অর্থ বাজারে প্রবেশ করানো হয়নি, যা বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট তৈরি করেছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, ‘২০২২ সালের সেপ্টেম্বরের পর থেকে ডলার সংকটের ক্ষেত্রে আমরা যেসব নীতিগত পদক্ষেপ দেখেছি, আমি বলব এটা ছিল ভুল দিকের পদক্ষেপ, যা সংকটকে আরো গভীর করেছে। ডলার সংকট সমাধানে যত দ্রুত সম্ভব বাজারভিত্তিক ডলার ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়ন করতে হবে। এখন ক্রলিং পেগ নামের একটি পদ্ধতি চালুর কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু এই পদ্ধতি পুরোপুরি কাজে আসবে বলে মনে হয় না। কারণ বিশ্বের অনেক দেশ এই ব্যবস্থায় ফেল করেছে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের পদক্ষেপ
রপ্তানির চেয়ে আমদানি বেশি হওয়ার কারণে প্রতিবছর বাণিজ্য ঘাটতিতে পড়ে বাংলাদেশ। এই ঘাটতি কমাতে গত বছর আমদানির ওপর একাধিক শর্ত আরোপ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে বিলাসী পণ্যে শতভাগ অগ্রিম জমা রাখা এবং ৩০ মিলিয়নের বেশি মূল্যের এলসি খোলার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি নেওয়া অন্যতম।
এ ছাড়া ডলার কারসাজি রোধে গত বছর ১০ বাণিজ্যিক ব্যাংককে ডলার কারসাজির দায়ে ১০ লাখ টাকা জরিমানা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। বেশি দামে ডলার কেনাবেচা করায় সাত মানি চেঞ্জারের লাইসেন্স স্থগিত করা হয়। বেশি দামে ডলার কেনার দায়ে দেশি-বিদেশি ছয় ব্যাংকের ট্রেজারি বিভাগের প্রধানদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। পরে শর্ত সাপেক্ষে তাঁদের অব্যাহতিও দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তার পরও নিয়ন্ত্রণে আসেনি ডলারের বাজার।
ডলার সংকট নিরসনে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মেজবাউল হক বলেন, ‘এখন আমদানি ব্যয় কমে আসায় ডলারের চাহিদা কমে এসেছে। স্বল্পমেয়াদি বিদেশি ঋণ পরিশোধের কিস্তির আকার দিন দিন কমছে। ফলে চাপ কমছে রিজার্ভের ওপর। ধীরে ধীরে স্থিতিশীল হচ্ছে ডলারের বাজার। তা ছাড়া ক্রলিং পেগ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হলে ডলারের বাজার আরো শান্ত হবে।’
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সহসভাপতি এবং বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের দেশ আমদানিনির্ভর। দীর্ঘদিন ধরেই আমাদের অর্থনীতি চাপে আছে। এখন হঠাৎ করে ডলারের দাম খুব বেশি হলে এর নেতিবাচক প্রভাব তৈরি হবে, বিশেষ করে আমদানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। পণ্যের আমদানি খরচ বেড়ে যাবে অনেক, এতে পণ্যের দামও বাড়াতে বাধ্য হবেন আমদানিকারকরা।’
এন এস


