অনিয়ম, দুর্নীতি ও লুটপাটে ডুবছে সোনালী লাইফ, অনিশ্চয়তায় গ্রাহক
টাকা আত্মসাৎ করায় সোনালী লাইফের পরিচালনা পর্ষদ সাসপেন্ড, প্রশাসক নিয়োগ
জিনান মাহমুদ:
সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের পরিচালনা পর্ষদ ৬ মাসের জন্য সাসপেন্ড করে প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম এম ফেরদৌস, এনডিসি, পিএসসিকে। আজ রোববার (২১ এপ্রিল) থেকেই প্রশাসক নিয়োগ কার্যকর করা হবে।
কোম্পানির চেয়ারম্যান ও পরিচালকদের ১৮৭ কোটি টাকা আত্মসাত করায় এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে আইডিআরএ। গত ১৮ এপ্রিল আইডিআরএ’র পরিচালক (উপসিচব) আব্দুল মজিদ স্বাক্ষরিত চিঠিতে এসব তথ্য জানিয়েছেন।
বীমা আইন, ২০১০ এর ৯৫(১) ধারা মোতাবেক সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লি: এর পরিচালনা পর্ষদ “সাসপেন্ড” ও প্রশাসক নিয়োগের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় বলেও আইডিআরএ চিঠিতে উল্লেখ করেছে।
একই সাথে, প্রশাসক দায়িত্ব গ্রহণের পর যতদ্রুত সম্ভব কোম্পানিটিতে দেশি বা বিদেশি নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করে একটি পূর্ণাঙ্গ নিরীক্ষা সম্পন্ন করবে। এ ছাড়াও বীমা পলিসি ইস্যুসহ কোম্পানির সকল কার্যক্রম পরিচালনা করবেন প্রশাসক- এমনটাই জানিয়েছে আইডিআরএ।
আইডিআরএ চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে-
সোনালী লাইফ ইন্সুরেন্স কোম্পানি লি: এর প্রাক্তন চেয়ারম্যান জনাব মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস ও কয়েকজন পরিচালকের বিরুদ্ধে প্রাপ্ত আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করার জন্য কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান “হুদা ভাসি চৌধুরী এন্ড কোম্পানি”-কে নিয়োগ করা হয়। তদন্তকারী প্রতিষ্ঠান কর্তৃক দাখিলকৃত প্রতিবেদনে নিম্নোক্ত অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য প্রমাণাদি পাওয়া যায়:
ক) কোম্পানির পরিচালক মিসেস নূর এ হাফজা, মিসেস ফৌজিয়া কামরুন তানিয়া, রূপালী ইন্সুরেন্স কোঃ, মিসেস শাফিয়া সোবহান চৌধুরী ও মি. শেখ মোহম্মদ ডানিয়েল এর নিকট থেকে কোনো টাকা গ্রহণ না করেই তাদের নামে মোট ১,১৬,৫০,০০০/- টাকার শেয়ার ইস্যু করা;
খ) কোম্পানির এফডিআর এর বিপরীতে সাউথ বাংলা ব্যাংক হতে ৮,৯৫,০০,০০০/- টাকা ঋণ ও সঞ্চয়ী হিসাব নং-০০০২১৩০০০০৩৩৪ হতে ১,৫৫,০০,০০০/- টাকা মোট ১০,৫০,০০,০০০/- টাকা উত্তোলন করে একই ব্যাংকে কোম্পানির হিসাব নং-০০০২৬২২০০০০৭৩ এ জমা করা হয় যা উল্লিখিত পরিচালকদের শেয়ার ক্রয়মূল্য হিসেবে প্রদর্শন করা;
গ) জনাব মোস্তফা গোলাম কুদ্দস তার স্ত্রী মিসেস ফজিলাতুননেসা, পুত্র মোস্তফা কামরুস সোবহান ও কন্যা ফৌজিয়া কামরুন তানিয়া, তাসনিয়া কামরুন আনিকা, মোস্তফা কামরুস সোবহান তার স্ত্রী শাফিয়া সোবহান চৌধুরী, তাসনিয়া কামরুন আনিকার স্বামী শেখ মোহাম্মদ ড্যানিয়েল পরস্পরের মধ্যে শেয়ার হস্তান্তর করে প্রয়োজনীয় ন্যূনতম শেয়ার ধারণের মাধ্যমে পরিবারের ০৭ জন সদস্য কোম্পানির বোর্ডে পরিচালক রেখে পারিবারিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে অনিয়মের সুযোগ তৈরী করেছেন;
ঘ) জুলাই, ২০২৩ হতে কোম্পানির ডিসেম্বর, ২০২৩ পর্যন্ত প্রতি মাসে ৩,০০,০০,০০০/- টাকা হিসেবে মোট ১৮ কোটি টাকা জনাব মোস্তফা গোলাম কুদ্দুসের ব্যক্তিগত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ড্রাগন সোয়েটারকে বোর্ডের অনুমোদন ছাড়া অবৈধভাবে প্রদান করা;
ঙ) বোর্ড সভার কার্যবিবরণীর জাল উদ্ধৃতাংশ দাখিল করে কোম্পানির এফডিআর এর বিপরীতে স্যোশ্যাল ইসলামি ব্যাংক, সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার ব্যাংক ও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামি ব্যাংক হতে মোট ১৯৫,৪২,৮১,২০০/- টাকা ঋণ গ্রহণ এবং তন্মধ্যে ৮৩,৯৯,০০,০০০/- টাকা কোম্পানির বিভিন্ন এ্যাকাউন্টে কয়েকবার স্থানান্তরের পর জনাব মোস্তফা গোলাম কুদ্দুসের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক একাউন্টে জমা করে যা আত্মসাৎ এবং ব্যাংক ঋণের সুদ পরিশোধ বাবদ (ইতোমধ্যে ১৮,২৯,০৭,৪৯৮/- টাকা) কোম্পানির ক্ষতি সাধন;
চ) জনাব মোস্তফা গোলাম কুদ্দুসের মালিকানাধীন ইম্পেরয়িাল ভবন কোম্পানি কর্তৃক ক্রয়ের জন্য স্বাক্ষরিত ২ টি সমঝোতা চুক্তির ফটোকপি তদন্তকালে পাওয়া যায়। তন্মধ্যে ০৫/১০/২০২১ তারিখে স্বাক্ষরিত চুক্তিতে জমি ও ভবনের মূল্য ৩৫০ কোটি টাকা এবং ১২/১২/২০২২ তারিখে স্বাক্ষরিত চুক্তিতে মূল্য ১১০ কোটি ৩১ লক্ষ টাকা মূল্য উল্লেখ আছে। উভয় চুক্তিই স্বাক্ষরকারী কোম্পানির ভারপ্রাপ্ত সি.ই.ও. জনাব রাশেদ বিন আমান (১ম পক্ষ) ও জনাব মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস (২য় পক্ষ) এবং সাক্ষী হিসেবে মিসেস নূর এ হাফজা ও মি. মোস্তফা কামরুস সোবহান। জমি/ভবনের ক্রয়ের উদ্দেশ্য, মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি, ধার্যকৃত মূল্য ও অন্যান্য শর্ত নির্দিষ্ট করে সমঝোতা চুক্তি দুটির কোনোটির বিষয়েই বোর্ডের কোনো সিদ্ধান্ত নেই এবং অসৎ উদ্দেশে চুক্তি দুটি করা হয়েছে মর্মে প্রতীয়মান;
ছ) জনাব মোস্তফা গোলাম কুদ্দুসের মালিকানাধীন ড্রাগন ইনফরমেশন টেকনোলজি ও কম্যুনিকেশন লি:, ড্রাগন সোয়েটার লি:, ইম্পেরিয়াল সোয়েটার লি: ও ড্রাগন সোয়েটার ও স্পিনিং লি: বরাবর বিভিন্ন সময়ে ১৪১,৫৬,১০,৫০০/- টাকা প্রদান যা এ্যাকাউন্ট হেডে “মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস, ল্যান্ড ওনার, এ্যাডভান্স এগেইন্সট ল্যান্ড” লেখা আছে। স্থাবর সম্পত্তি ক্রয়ের নিমিত্ত কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ব্যতিত অগ্রিম পরিশোধ অবৈধ। প্রকৃতপক্ষে আত্মসাৎকৃত অর্থ জমি/ভবন ক্রয়ের অগ্রিম হিসেবে বৈধতা দেয়ার অপপ্রয়াস নেয়া হয়েছে;
জ) ইম্পেরিয়াল ভবন ১২.৫০ কাঠা জমির উপর নির্মিত হলেও ০৭ কাঠা জমির উপর ভবন নির্মাণের জন্য রাজউকের অনুমোদন আছে। অবশিষ্ট ৫.৫০ কাঠার বরাদ্দপত্র, লীজ চুক্তি ও ভবন নির্মাণের অনুমোদন নেই। ফলে জমির মালিকানা নিষ্কন্টক নয় ও ভবন নির্মাণ অবৈধ;
ঝ) কোম্পানির তহবিল থেকে ২০২১-২৩ মেয়াদে জনাব মোস্তফা গোলাম কুদ্দুসের মালিকানাধীন ড্রাগন সোয়েটার লি: কে সোয়েটার ক্রয়বাবদ ২,৬৫,০০,০০০/- টাকা, ইম্পেরিয়াল স্যুটস এন্ড কনভোকেশন সেন্টারকে আপ্যায়ন বাবদ ১,৭৮,৬২,৫৯২/- টাকা এবং ড্রাগন ইনফরমেশন টেকনোলজি ও কম্যুনিকেশন লি:কে ইআরপি মেইনটেনেন্স ও সোয়েটার ক্রয় বাবদ ৩,৪২,০৬,২২৫ টাকা অর্থাৎ মোট ৭,৮৫,৬৮,৮১৭/- টাকা অবৈধভাবে প্রদান;
ঞ) জনাব মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস নিজে ও তার পরিবারের ৬ সদস্য এবং আরেকজন পরিচালক সাবেক চেয়ারম্যান নুর এ হাফজাসহ মোট ৮ জন পরিচালক অবৈধভাবে মাসিক বেতন হিসাবে মোট ২,২৪,০০,০০০/- টাকা গ্রহণ;
ট) আইডিআরএ এর সার্কুলার অমান্য করে চেয়ারম্যানের জন্য ১.৭০ কোটি টাকায় একটি বিলাসবহুল গাড়ি (Audi car) ঢাকা মেট্রো-ঘ-১৭-৩৬৯৫০ ক্রয় এবং ২০২১-২৩ মেয়াদে নতুন গাড়ির কথিত রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ ২১,৫২,৫০৫/- টাকা ব্যয়;
ঠ) কোম্পানির ঘোষিত ডিভিডেন্ডে অতিরিক্ত ডিভিডেন্ড বাবদ বিবিধ খাত থেকে রুপালী ইন্সুরেন্স কো: এবং পরিচালক নুর এ হাফজাকে মোট ১,৬০,১০,৭৫০/- টাকা পরিশোধ করা যা অবৈধ ও আত্মসাৎ;
ড) কোম্পানির সাবেক চেয়ারম্যান জনাব মোস্তফা গোলাম কুদ্দুসের বিদেশে চিকিৎসার খরচ বাবদ ১,০৮,৭৫,৮০০/- টাকা, ভ্রমণ ও শপিং বাবদ ৩,৭৬,৪৮০/- টাকা এবং মেয়ের foreign study ব্যয়বাবদ ৪৫,১৫,০০০/- টাকা মোট ১,৫৮,৬৭,২৮০/- টাকা ব্যাংক থেকে উত্তেলেন করে পেটিক্যাশ খাতে ব্যয় দেখানো হয়েছে যা অবৈধ ও আত্মসাৎ;
ঢ) পরিচালক, শেখ মোহাম্মদ ড্যানিয়েলকে বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার ওনার এসোসিয়েশনের গ্রুপ বীমা পলিসি থেকে অবৈধভাবে ৯,০০,০০০/- টাকা কমিশন প্রদান এবং তিনি পদত্যাগ করে পরিচালক না থাকাকালীন ১১ টি বোর্ড সভায় অবৈধভাবে অংশগ্রহণ ও ৮৮,০০০/- টাকা সম্মানী গ্রহণ করেন এবং পরিচালক না হয়েও চেক স্বাক্ষর করেন যা সম্পূর্ণ অবৈধ;
ণ) জনাব মোস্তফা গোলাম কুদ্দুসের ব্যক্তিগত ঋণ সমন্বয় বাবদ ২০১৬-১৮ সালে ৬২,৫০,০০০/- টাকা, বিজিএমইকে অনুদান ৫২,৫০০/- টাকা, এসি (আনিকার জন্য) ক্রয় ১,৮১,৭৭৮/- টাকা, বিবাহ বার্ষিকীর উপহার বাবদ ১৫,০০,০০০/- টাকা, এমডির জন্মদিন উদযাপনের সাজসজ্জা, ডায়মন্ড রিং ইত্যাদি বাবদ ১১,৭৫,০০০/- টাকা, অনুষ্ঠান, ২০২২ সালে চেয়ারম্যানের কুরবানির গরু ও ২০২৩ সালে ঈদে এতিমখানার জন্য গরু ক্রয় বাবদ ৯,২৭,০০০/- টাকা, পারিবারিক বিনোদন- সোনারগাঁও হোটেলের বিল ও ফ্যান্টাসি কিংডম ভ্রমণ ব্যয় ৩,৪২,২৪০/- টাকা, জনাব মোস্তফা গোলাম কুদ্দুসের নিজের ও পরিবারের সদস্যদের বিদেশ (লন্ডন, দুবাই ইত্যাদি) ভ্রমণ ব্যয় ৪,৯৮,৯৪,৩৬১/- টাকা, আইপিও খরচের নামে অতিরিক্ত ১,০০,০০,০০০/- টাকা, পলিসি নবায়ন উপহার বাবদ নিজ প্রতিষ্ঠানের জন্য ১,৫২,৬৭,২০০/- টাকা সর্বমোট ৮,২৬,৬৭,৮৫৯/- টাকা প্রদান করা হয়েছে যা অবৈধ ও কোম্পানির অর্থ আত্মসাৎ;
ত) কোম্পানির অফিসের জন্য জনাব মোস্তফা গোলাম কুদ্দুসের মালিকানাধীন ইম্পেরিয়াল ভবনের ২০১৩ সাল হতে ২০২৭ সাল পর্যন্ত ভাড়ার চুক্তি দেখিয়ে ২০২২ সাল পর্যন্ত ভাড়া বাবদ ১১,৯৪,২০,০১৭/- টাকা ড্রাগন সোয়েটারকে অবৈধভাবে প্রদান করা হয়েছে;
থ) ইম্পেরিয়াল ভবনে সোনালী লাইফ ইন্সুরেন্স কো: ছাড়াও (১) ইম্পেরিয়াল ক্যাফে (২) ন্যাশনাল ব্যাংক লি: (৩) ইম্পেরিয়াল স্যুটস এন্ড কনভেনশন সেন্টার, (৪) স্টার্লিং স্টক এন্ড সিকিউরিটিজ লিঃ (৫) রূপালী ইন্সুরেন্স কো:
(৬) ইম্পেরিয়াল হেল্থ ক্লাব (জিম) থাকলেও পুরো ভবনের বিদ্যুৎ ও ওয়াসার বিল সোনালী লাইফ ইন্সুরেন্স কো: থেকে ১,৭২,৪২,২২৩/- টাকা পরিশোধ করে কোম্পানির আর্থিক ক্ষতি সাধন ও অবৈধভাবে সুবিধা গ্রহণ;
দ) ড্রাগন সোয়েটার ও স্পিনিং লি: এর ট্যাক্স বাবদ কোম্পানির বিবিধ খাত হতে ১৩,৭৫,০০০ টাকা উপকর কমিশনার, সার্কেল ২২৮, জোন ১১ বরাবর পরিশোধ করা।
ধ) উপর্যুক্ত বিবরণ অনুযায়ী অবৈধভাবে কোম্পানির তহবিল থেকে আত্মসাৎকৃত অর্থের পরিমাণ মোট ১৮৭,৮৪,১৫,৯৬৬/- টাকা।
২.০ তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে,
১) তদন্ত কার্যক্রম কার্যপরিধির মধ্যে সীমিত রেখে নমুনাভিত্তিক যাচাইয়ের ফলে সকল অনিয়মের তথ্য এ প্রতিবেদনে আসেনি। পূর্ণাঙ্গ আর্থিক চিত্রের জন্য কোম্পানিটির বিস্তারিত নিরীক্ষা প্রয়োজন। কোম্পানির অসম্পূর্ণ তথ্য সংরক্ষণ বা তথ্য গোপন, অস্বচ্ছ হিসাবরক্ষণ পদ্ধতি, অভ্যন্তরীণ কন্ট্রোল সিস্টেমের অনুপস্থিতি এবং মূখ্য নির্বাহী কর্মকর্তাসহ ব্যাংক সিগনেটরিরা প্রায় সকলেই একই পরিবরের সদস্য হওয়ায় কোম্পানির অর্থ আত্মসাতের সহায়ক অবস্থা তৈরী করেছে। বছরে গড়ে ২২ কোটি বা মাসে প্রায় ২ কোটি টাকা পেটি ক্যাশ হিসেবে ব্যয় হয়েছে এবং এককালীন বড় অংকের লেনদেন ক্যাশ চেকে হয়েছে যা সম্পূর্ণ বেআইনী ও অর্থ তসরূপের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
৩.০ সার্বিক পর্যলোচনায় সোনালী লাইফ ইন্সুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড তার বোর্ডের কতিপয় পরিচালকের দ্বারা কোনো আইন ও আর্থিক বিধিবিধানের তোয়াক্কা না করে পরিচালনার ফলে বিপুল অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ হয়েছে এবং বীমাকারী ও বীমা গ্রাহকদের স্বার্থ মারাত্মক হুমকীর সম্মুখীন হয়েছে মর্মে প্রতীয়মান হওয়ায় এবং বীমাকারী ও বিপুল সংখ্যক বীমা গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষার্থে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের নিমিত্ত বীমা আইন, ২০১০ এর ৯৫ ধারা মোতাবেক কোম্পানীর বোর্ড “সাসপেন্ড” করে কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণাধীনে বীমাকারীর কার্যক্রম ব্যবস্থাপনার জন্য প্রশাসক নিয়োগ করা সমীচীন প্রতীয়মান হওয়ায় বিগত ০৪/০৪/২০২৪ তারিখের ৫৩.০৩.০০০০.০৭১.২৭.০২৯.২৩.৪৬ নং স্মারকে বীমা আইন, ২০১০ এর ৯৫(১) ধারা মোতাবেক এ বিষয়ে বোর্ডের কোনো বক্তব্য থাকলে তা ০৫ কার্য দিবসের মধ্যে লিখিতভাবে কর্তৃপক্ষের নিকট দাখিলের জন্য এবং মৌখিক শুনানীতে ইচ্ছুক হলে ১৮/০৪/২০২৪ তারিখ সকাল ১১.০০টায় কর্তৃপক্ষের সভাকক্ষ-১ এ উপস্থিত থাকার জন্য সোনালী লাইফ ইন্সুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড এর বোর্ডকে অনুরোধ করা হয়।
৪.০ কোম্পানির লিখিত জবাব ও শুনানী: কোম্পানির পরিচালক জনাব নূর এ হাফজা পৃথকভাবে জবাব দাখিল করেন। বোর্ডের ৩ জন পরিচালক জনাব আহমেদ রাজিব সামদানী, হুদা আলী সেলিম ও হাজরা হোসাইন গত ১৭ এপ্রিল ২০২৪ তারিখে বোর্ড থেকে পদত্যাগ করেছেন বলে লিখিতভাবে জানান। অন্যদিকে বোর্ডের পক্ষে বোর্ডের চেয়ারম্যান কাজী মনিরুজ্জামান একটি জবাব দাখিল করেন। লিখিত জবাব ও শুনানী সংক্ষেপে নিম্নরূপ:
৪.১ পরিচালক জনাব নূর এ হাফজা তার লিখিত জবাবে বলেন যে, তার নামে ইস্যুকৃত প্লেসমেন্ট শেয়ারের মূল্য তিনি পে-অর্ডারের মাধ্যমে পরিশোধ করেন যার ফটোকপি সংযুক্ত করেছেন। তিনি প্রতি মাসে ৩ লক্ষ টাকা হিসেবে বেতন এবং অতিরিক্ত ডিভিডেন্ড গ্রহণের বিষয় স্বীকার করেন। তাকে এ অর্থ বৈধভাবে দেয়া হচ্ছে বলায় তিনি গ্রহণ করেন এবং এখন তিনি এ টাকা ফেরৎ দিতে ইচ্ছুক মর্মে জানান। তিনি কোম্পানি থেকে অর্থাৎ জনাব মোস্তফা গোলাম কুদ্দসের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানকে প্রদানের কিছু চেকে তৎকালীন চেয়ারম্যান হিসেবে স্বাক্ষরের বিষয়টি স্বীকার করেন এবং তিনি পুরোপুরি না বুঝে জনাব মোস্তফা গোলাম কুদ্দুসের কথামত স্বাক্ষর করেন বলে দাবি করেছেন।
৪.২ বোর্ডের পক্ষে বর্তমান চেয়ারম্যান কাজী মনিরুজ্জামানের স্বাক্ষরিত জবাবে বোর্ড সভায় জনাব মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের বিষয়ে যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন তা উল্লেখ করা হয়েছে। জনাব মোস্তফা গোলাম কুদ্দুসের প্রদত্ত ব্যাখ্যায় তিনি নিজের ও তার পরিবারের সদস্যদের অনুকূলে ইস্যুকৃত শেয়ারের মূল্য, তার ও তার পরিবারের সদস্যদের মাসিক বেতন গ্রহণ, তার মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানসমূহকে অর্থ প্রদান, তার ও তার পরিবারের বিদেশ ভ্রমণ, বিদেশে শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ বিভিন্ন ব্যয় পরিশোধ, ইত্যাদি প্রায় সবই (কিছু ক্ষেত্রে টাকার অংকে সামান্য পার্থক্যসহ) স্বীকার করেছেন। তবে তিনি দাবী করেছেন যে, কোম্পানির কাছে তার অফিস ভাড়াবাবদ জানুয়ারি ২০২৪ পর্যন্ত ১১৫,৭৬,৫৮,৮০০/- টাকা ও বিলম্ব ফি বাবদ ২৩,১৩,৮৩,৫৭৬/- এবং কোম্পানির ঋণ ১০,১৩,৩০,৯৪২/-টাকাসহ তার মোট প্রাপ্য ১৪৯,০৩,৭৩,৩১৮/- টাকা হতে এ টাকা (তার হিসেবমতে ১৫৮,৩৭,২৩,৩০৫/- টাকা) তিনি গ্রহণ/ সমন্বয় করেছেন।
৪.৩ দাখিলকৃত অফিস ভাড়ার চুক্তির ফটোকপি থেকে দেখা যায় যে, ভবন মালিক হিসেবে জনাব মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস ও কোম্পানির পক্ষে তার মেয়ের জামাতা স্পনসর পরিচালক জনাব ডেনিয়েল স্বাক্ষর করেছেন; কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা বা চেয়ারম্যান স্বাক্ষর করেন নি। ২০১৩ সাল হতে ২০২৭ সাল পর্যন্ত বছরভিত্তিক ফ্লোর এরিয়ার চাহিদা নির্ধারণ করে মোট ১৮৪,৫২,২২,৮০০/- টাকার ভাড়া চুক্তি ২০১৩ সালেই সম্পাদন করা হয়েছে।
৪.৪ কোম্পানির এফডিআর এর বিপরীতে ব্যাংক হতে (৮,৯৫,০০,০০০+১৯৫,৪২,৮১,২০০) মোট ২০৪,৩৭,৮১,২০ টাকা ঋণ গ্রহণ করার বিষয়ে বোর্ড অবহিত নয় মর্মে দাবী করা হয়েছে তবে উক্ত অর্থ থেকে ৭৪,৪০,০০,০০০/- টাকা জনাব গোলাম কুদ্দুস তার মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানকে প্রদানের বিষয়টি (কথিত অফিস ভাড়া) স্বীকার করেছেন।
৪.৫ জনাব মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস বোর্ডকে জানিয়েছেন যে, তার মালিকানাধীন ড্রাগন সোয়েটার লি:, ড্রাগন আইটি, ইম্পেরিয়াল কনভেনশন সেন্টারকে প্রদত্ত টাকা যথাযথভাবে কাজের/পণ্যের বিনিময়ে প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু এর যথাযথ প্রমাণক এতো বড় অংকের অর্থ ব্যয়ের যৌক্তিকতা পাওয়া যায় নি।
৪.৬ শুনানিতে কোম্পানির বর্তমান চেয়ারম্যান বলেন যে, জনাব মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস ও তার পরিবারের সদস্য পরিচালকদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে বোর্ড সভায় জনাব মোস্তফা গোলাম কুদ্দুসের দেয়া ব্যাখ্যাই কর্তৃপক্ষের বরাবরে প্রেরণ করা হয়েছে। জনাব মোস্তফা গোলাম কুদ্দুসের পরিবারের সদস্য ব্যতিত অন্য পরিচালকগণ বলেন, তারা সকল বিষয়টি অবহিত নয়, বোর্ড সভায় যা জানানো হতো তাই জেনেছেন।
৫.০ কোম্পানির চেয়ারম্যান/পরিচালকদের লিখিত জবাব, শুনানিকালে উপস্থাপিত বক্তব্য ও উপস্থাপিত তথ্যাদি পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, সাবেক চেয়ারম্যান জনাব গোলাম কুদ্দুস নিজের ও তার পরিবারের সদস্যদের অনুকূলে ইস্যুকৃত শেয়ারের মূল্য, তার ও তার পরিবারের সদস্যদের মাসিক বেতন গ্রহণ, তার মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানসমূহকে অর্থ প্রদান, তার ও তার পরিবারের বিদেশ ভ্রমণ, বিদেশে শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ বিভিন্ন ব্যয়, ইত্যাদি প্রায় সবই (কিছু ক্ষেত্রে টাকার অংকে সামান্য পার্থক্যসহ) তিনি স্বীকার করেছেন। তবে এ টাকা তিনি তার প্রাপ্য অফিস ভাড়া বাবদ গ্রহণ করেন বলে দাবী করেছেন। তার এ দাবীর সাথে কোম্পানির বুক অফ একাউন্টস, লেজার, সিস্টেম জেনারেটেড ভাউচার, ব্যাংক এডভাইস, চেক ইত্যাদি ডক্যুমেন্টের মিল/সামঞ্জস্য নেই। কোম্পানির বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন এবং নিরীক্ষিত হিসাব বিবরণীতেও এ ব্যয় অফিস ভাড়া হিসাবে প্রদর্শিত হয়নি। কোম্পানির টাকায় ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিপুল ব্যয়ভার বহন, নগদ গ্রহণ ও নিজ মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে অর্থ স্থানান্তরের বিষয় উদঘাটিত হওয়া তা ভাড়া হিসবে গ্রহণের দাবী করা হয়েছে মর্মে প্রতীয়মান হয়।
অন্যদিকে, ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত কোম্পানির অফিসের জন্য ২০১৩ সাল হতে ২০২৭ সাল পর্যন্ত বছরভিত্তিক ফ্লোর এরিয়ার চাহিদা নির্ধারণ করে মোট ১৮৪,৫২,২২,৮০০/- টাকার ভাড়া চুক্তি ২০১৩ সালেই সম্পাদন এবং কোম্পানির পক্ষে মূখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা বা চেয়ারম্যানের পরিবর্তে ভবন মালিকের জামাতা স্পনসর পরিচালক কর্তৃক চুক্তিস্বাক্ষর অযৌক্তিক, অগ্রহণযোগ্য ও অপকৌশল প্রমাণ করে।
কোম্পানির এফডিআর এর বিপরীতে মোট ২০৪,৩৭,৮১,২০০/- টাকা (৮,৯৫,০০,০০০+ ১৯৫,৪২,৮১,২০০) ঋণ গ্রহণ করে দায় সৃষ্টি ও সুদ প্রদান বিষয়ে বোর্ড অবহিত নয় মর্মে দাবি করা হয়েছে যা অগ্রহণযোগ্য ও বোর্ডের দায়িত্ব এড়ানোর অপপ্রয়াস। অন্যদিকে উক্ত অর্থ থেকে ৭৪,৪০,০০,০০০/- টাকা জনাব মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস তার মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানকে প্রদানের বিষয়টি (কথিত অফিস ভাড়া) স্বীকার করেছেন যা পরস্পর বিরোধী।
অসম্পূর্ণ তথ্য সংরক্ষণ বা তথ্য গোপন, অস্বচ্ছ হিসাবরক্ষণ পদ্ধতি, অভ্যন্তরীণ কন্ট্রোল সিস্টেমের অনুপস্থিতি, ক্যাশ চেকে বড় অংকের লেনদেন, এফডিআর জামানত রেখে বিপুল পরিমান ব্যাংক ঋণ গ্রহণ এবং মূখ্য নির্বাহী কর্মকর্তাসহ ব্যাংক সিগনেটরিরা প্রায় সকলেই একই পরিবরের সদস্য হওয়ার মাধ্যমে বীমাকারী এমনভাবে কোম্পানির কার্যক্রম পরিচালনা করছে যে, এতে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের মাধ্যমে কোম্পানি ও বীমা গ্রাহকদের স্বার্থ মারাত্মকভাবে ক্ষুন্ন হচ্ছে।
৬.০ এমতাবস্থায়, বীমাকারী ও বিপুল সংখ্যক বীমা গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষার্থে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের নিমিত্ত বীমা আইন, ২০১০ এর ৯৫ ধারা মোতাবেক নিম্নোক্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো:
ক) বীমা আইন ২০১০ এর ধারা-৯৫(১) এর প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড এর বিদ্যমান পরিচালনা পর্ষদকে ০৬ (ছয়) মাসের জন্য “সাসপেন্ড” করা হলো।
খ ) কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণাধীনে বীমাকারীর কার্যক্রম ব্যবস্থাপনার জন্য ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এস এম ফেরদৌস, এনডিসি, পিএসসি, (অব:)-কে প্রশাসক নিয়োগ করা হলো।
গ) নিয়োজিত প্রশাসক কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নির্ধারিত মাসিক সম্মানী প্রাপ্য হবেন ও প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ভাতাদি পাবেন। ঘ) যথাশীঘ্র সম্ভব একটি যোগ্য দেশী/বিদেশী একটি অডিট ফার্ম দ্বারা কোম্পানির পূর্ণাঙ্গ অডিট সম্পন্ন করতে হবে।
ঙ) নিয়োগপ্রাপ্ত প্রশাসক বীমা আইন ২০১০ এর ধারা-৯৬ (১) অনুযায়ী কর্তৃপক্ষের নিকট যথাশীঘ্র একটি প্রতিবেদন দাখিল করবেন ও বীমা আইন ২০১০ এর ৯৫(৩) ধারার আলোকে বীমা পলিসি ইস্যুসহ সকল কার্যক্রম পরিচালনা করবেন।
৭.০ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে এ আদেশ জারী করা হলো এবং তা আজ ২১.০৪.২০২৪ তারিখ থেকে কার্যকর হবে।
এর আগে গত ৪ এপ্রিল এক চিঠিতে সোনালী লাইফের পরিচালনা পর্ষদ সাসপেন্ড করে কেন প্রশাসক নিয়োগ দেয়া হবে না তার ব্যাখ্যা চেয়ে চিঠি দেয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ। ৫ কার্য দিবসের মধ্যে লিখিতভাবে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়। একইসঙ্গে ১৮ এপ্রিল কর্তৃপক্ষে আয়োজিত এ সংক্রান্ত শুনানিতে উপস্থিত থাকতে বলা হয়। গত ১৮ এপ্রিল অনুষ্ঠিত শুনানিতে অংশ নেন সোনালী লাইফের পরিচালনা পর্ষদ সদস্যরা।
এর আগে সোনালী লাইফের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তদন্ত করতে ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর অডিট ফার্ম হুদাভাসী চৌধুরী এন্ড কোং-কে নিরীক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়। নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওই তদন্তে সোনালী লাইফে ১৮৭ কোটি ৮৪ লাখ ১৫ হাজার ৯৬৬ টাকা আত্মসাতের প্রমাণ উঠে আসে।


