গ্যাস বিদ্যুৎ সারের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব অর্থ বিভাগের
গ্যাস, বিদ্যুৎ, জ্বালানি তেল এবং সারের সরবরাহ ও বিপণন ব্যবস্থাপনা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করে সরকার। মূল্যস্ফীতি ও জনসাধারণের ওপর বিরূপ প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে এসব পণ্য ও সেবার দাম নির্ধারণ করা হয়। এজন্য ভোক্তা পর্যায়ে মূল্য সহনশীল রাখতে দীর্ঘদিন ধরেই এসব খাতে ভর্তুকি দিয়ে আসছে সরকার। আন্তর্জাতিক বাজারে এসব খাতে দাম বাড়লে দেশেও তার প্রভাব পড়ে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাস ও জ্বালানি তেলের ঊর্ধ্বগতির কারণে ভর্তুকির পরিমাণ কয়েক গুণ বাড়তে পারে। এতে চাপে পড়তে পারে বাজেট ব্যবস্থাপনা। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে এবার সার, এলপিজি ও বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে ভর্তুকির চাপ কমানোর প্রস্তাব করেছে অর্থ বিভাগ। এরই মধ্যে ডিজেল, কেরোসিনের তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম বাড়ানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে এ বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করে আগামী জানুয়ারিতেই বাড়তি দাম কার্যকর করার প্রস্তাব করা হয়। গতকাল অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের সভাপতিত্বে ‘বাজেট ব্যবস্থাপনা ও সম্পদ কমিটির বৈঠকে এ প্রস্তাব করে অর্থ বিভাগ। সভায় এসব পণ্যের যৌক্তিক দাম নির্ধারণ করে সংশ্লিষ্টদের প্রস্তাব পাঠাতে বলেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, সবার সঙ্গে আলোচনা করে এ বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। বৈঠক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। সভায় পরিকল্পনামন্ত্রী, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিবরা উপস্থিত ছিলেন। উল্লেখ্য, চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে ভর্তুকি, প্রণোদনা ও ঋণ বাবদ ৪৯ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে।
সভায় অর্থ বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হয়, চলতি অর্থবছরে বিদ্যুতের জন্য ভর্তুকি বাবদ বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৯ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু বর্তমানে বিদ্যুৎ খাতে গ্যাস সরবরাহ হ্রাসের কারণে তরল জ্বালানিভিত্তিক কেন্দ্র থেকে অধিক পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদিত হওয়ায় চলতি অর্থবছরে ভর্তুকি বাবদ ১৬ হাজার ৪৩৭ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড। চলতি বাজেটে বিদ্যুৎ খাতে এ পরিমাণ ভর্তুকি দেয়া সম্ভব নয়। তাই আগামী নতুন বছরের শুরু থেকেই বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়। এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) উচ্চমূল্য থাকায় এ খাতে ভর্তুকির পরিমাণে যে অর্থ রাখা হয়েছে, মূল্য বাড়ানো না হলে এ ভর্তুকির পরিমাণও কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। তাই গ্যাসের দামও বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়।
ভর্তুকির সার্বিক বিষয়ে গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বিশ্ববাজারে সার, তেল, গ্যাসের দাম বাড়ায় ভর্তুকির চাপ বাড়বে। তাই বাজেট থেকে এত পরিমাণ অর্থ দেয়ার সক্ষমতা নেই সরকারের। এজন্য অনেক দিন থেকেই রাজস্ব আহরণের পরিমাণ বাড়িয়ে সরকারের সক্ষমতা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়ে আসছি। কিন্তু রাজস্ব আহরণ বাড়াতে পারছে না সরকার। এজন্য দাম বাড়াতে হলে সবদিক বিবেচনায় নিয়ে সহনীয় পর্যায়ে তা বাড়াতে হবে।
সারে ভর্তুকির বিষয়ে সভায় অর্থ বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হয়, অন্যান্য সারের পাশাপাশি দেশে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১৬ লাখ টন ইউরিয়া সার আমদানি করা হয়। ২০১০-১১ এবং ২০১১-১২ অর্থবছরে ইউরিয়ার সারের আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য টনপ্রতি ৪০০ থেকে ৫০০ মার্কিন ডলারের মধ্যে ওঠানামা করে। সে সময় সার বাবদ ভর্তুকির পরিমাণ সহনীয় পর্যায়ে রাখতে কৃষক পর্যায়ে খুচরা মূল্য কেজিপ্রতি ১২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ টাকা করা হয়। ২০১৩ সালের শুরুর দিকে ইউরিয়ার আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য স্থিতিশীল হতে শুরু করে। এ পরিপ্রেক্ষিতে সে বছরের আগস্টে কৃষক পর্যায়ে খুচরা মূল্য কেজিপ্রতি ২০ টাকা থেকে কমিয়ে পুনরায় ১৬ টাকা করা হয়।
এরপর ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য স্থিতিশীল থাকায় কৃষক পর্যায়ে খুচরা মূল্য পরিবর্তন করার প্রয়োজন হয়নি। একই সঙ্গে সার বাবদ ভর্তুকির পরিমাণ সহনীয় মাত্রায় রাখা সম্ভব হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের সময় সার বাবদ ভর্তুকির পরিমাণ প্রাক্কলন করা হয়েছিল ৯ হাজার ২০০ টাকা। কিন্তু গত জুলাই থেকে অক্টোবর সময়ে ইউরিয়ার পাশাপাশি টিএপি এবং এমওপি সারের আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৮০ থেকে ১০০ শতাংশ। এ মূল্যবৃদ্ধির কারণে সব ধরনের সার মিলিয়ে চলতি অর্থবছরে এক্ষেত্রে ভর্তুকির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়াতে পারে ২৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি। চলতি অর্থবছরে গড়ে ইউরিয়ার আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য টনপ্রতি ৭০০ ডলারের মধ্যে থাকবে বলে অর্থ মন্ত্রণালয় আশা করছে। এতে করে শুধু ইউরিয়া সারের জন্য ভর্তুকির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে প্রায় ৭ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। শুধু সারে এ পরিমাণ ভর্তুকি দিয়ে বাজেট ব্যবস্থাপনা চরম চাপে পড়বে বলে মনে করছে অর্থ বিভাগ। তাই আগামী জানুয়ারিতেই সারের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়।
অবশ্য খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থে এখনই সারের মূল্য বৃদ্ধি করতে চায় না কৃষি মন্ত্রণালয়। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আবদুর রাজ্জাক বলেন, অর্থ বিভাগ ঠিকই বলছে, ভর্তুকি এত বাড়লে বাজেট ব্যবস্থাপনা খুবই কঠিন হয়ে যাবে। তবে খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় ভর্তুকি বাড়লেও সরকার এখনই সারের দাম বাড়াবে না। বাজেট থেকেই ভর্তুকি সমন্বয় করা হবে। আরো কিছুদিন সারের দাম পর্যবেক্ষণ করতে চায় সরকার।
দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ভালো অবস্থায় রয়েছে—বৈঠকে উল্লেখ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। বৈঠকে বলা হয়, রেমিট্যান্স ছাড়া আমদানি, রফতানি, এডিপি বাস্তবায়ন রাজস্ব আদায়ের হার ভালো রয়েছে। কিন্তু চিন্তা ফেলে দিয়েছে সার্বিক ভর্তুকি।


