শিরোনাম
down of head

কী করতে যাচ্ছে ফেসবুক?

জাকারবার্গ রিব্র্যান্ডিংয়ের অংশ হিসেবে ফেসবুকের প্রাতিষ্ঠানিক নাম পরিবর্তনের দাবি করলেও তা মানতে নারাজ সমালোচকরা।

বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় ও বহুল ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের প্রাতিষ্ঠানিক বা কোম্পানির নতুন নাম মেটা প্ল্যাটফর্মস, সংক্ষেপে মেটা। অর্থাৎ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাপ বা সাইটটি আগের, তথা ফেসবুক নামেই থাকছে; কিন্তু ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ ইত্যাদি এখন থেকে সামগ্রিকভাবে পরিচালনা করবে মেটা, যা আগে ছিল ফেসবুকের অধীনে।

ফেসবুক, তথা মেটার সহ-প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গ বৃহস্পতিবার এ ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি জানান, ভার্চুয়াল বিশ্ব গড়ার মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে ‘কোম্পানি রিব্র্যান্ডিং’-এর এ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।

রিব্র্যান্ডিং হলো এক ধরনের বিপণন কৌশল। আগে থেকেই বাণিজ্যিকভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রিব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে নতুন নাম, প্রতীক, ধারণা ইত্যাদি গ্রহণ করে। রিব্র্যান্ডিংয়ের লক্ষ্য হলো গ্রাহক, বিনিয়োগকারী, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান ও অন্য শেয়ারহোল্ডারদের মনে একটি নতুন ও ভিন্ন পরিচয়ে জায়গা তৈরি করা।

এর আগে এমনই একটি কাঠামো গ্রহণ করেছিল গুগলও। ইন্টারনেটভিত্তিক পণ্য উৎপাদন-বিক্রয় ও সেবাদানকারী বহুজাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানটি ২০১৫ সালে অ্যালফাবেট নামের একটি হোল্ডিং কোম্পানির অধীনে পুনর্গঠিত হয়।

এবিসি নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়, জাকারবার্গ রিব্র্যান্ডিংয়ের অংশ হিসেবে ফেসবুকের প্রাতিষ্ঠানিক নাম পরিবর্তনের দাবি করলেও তা মানতে নারাজ সমালোচকরা। তারা বলছেন, সাম্প্রতিক কিছু বিতর্ক থেকে নজর ঘোরাতে এবং ব্যবসায়িক চর্চার ধরন নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও আইনপ্রণেতাদের তোপের মুখে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে ফেসবুক।

এ অবস্থায় জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, সাধারণ সংগঠন হিসেবে ফেসবুক নাম পাল্টে মেটা হলে আদতে কী লাভ হবে।

ফেসবুকের নাম পরিবর্তনের অর্থ কী

ফেসবুক কোম্পানি আগের নাম পাল্টে নতুন নাম মেটায় পরিচিত হবে। কিন্তু সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং অ্যাপের নাম থাকবে আগেরটাই- ফেসবুক।

নতুন নাম গ্রহণের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি নতুন প্রতীক বা লোগোও নির্ধারণ করেছে মেটা।

এক বিবৃতিতে মেটা জানিয়েছে, নতুন নাম গ্রহণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির মালিকানাধীন বর্তমান ও ভবিষ্যতের সব অ্যাপ ও প্রযুক্তি একটি সাধারণ কোম্পানি ব্র্যান্ডের অধীনে পরিচালনা করা হবে।

২০০৪ সালে চালু হয় ফেসবুক। এরপর প্রতিষ্ঠানটি ব্যবসা সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপ নামের আরও দুটি সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং অ্যাপ কিনে নেয়।

এ ছাড়া গত কয়েক বছরে অন্যান্য প্রযুক্তিতেও বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করে প্রতিষ্ঠানটি। যেমন ডিজিটাল ওয়ালেট ‘নোভি’, ভিডিও-কলিং ডিভাইস ‘পোর্টাল’ ও ভার্চুয়াল রিয়েলিটি সিস্টেম ‘অকুলাস’।

এই সবগুলো প্রতিষ্ঠানের ‘মাদার অর্গানাইজেশন’, অর্থাৎ সাধারণ মালিক বা পরিচালনাকারী মূল ও একক প্রতিষ্ঠান এখন মেটা, যা আগে ছিল ফেসবুক।

জাকারবার্গের এ রিব্র্যান্ডিং কৌশলের বড় অংশজুড়ে থাকবে ‘মেটাভার্স’ নামের একটি উচ্চাভিলাষী প্রকল্প। মেটাভার্সকে বলা হচ্ছে এমন এক ডিজিটাল বিশ্ব বা ভার্চুয়াল বাস্তবতা, যেখানে মানুষের পক্ষে বিভিন্ন ডিভাইসের মাধ্যমে স্থান পরিবর্তন করা সম্ভব হবে এবং তারা এক ধরনের ভার্চুয়াল পরিবেশে যোগাযোগ করতে পারবে।

কিন্তু সমালোচকদের সন্দেহ, অভ্যন্তরীণ নথি ফাঁসের পর তুমুল বিতর্কের মুখে সাধারণ মানুষের নজর ঘোরাতে এ পদক্ষেপ নিয়েছে ফেসবুক।

সম্প্রতি এসব নথি ফাঁস করেন ফেসবুকের সাবেক কর্মকর্তা ফ্রান্সেস হাওগেন। সেসব নথি বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম খবর প্রকাশ করে, সারা বিশ্বের ব্যবহারকারীদের ওপর নেতিবাচক ও ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে মাথাব্যথা নেই ফেসবুকের। এ সংক্রান্ত সব সতর্কতা বারবার উপেক্ষা করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

মেটাভার্স কী

বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তিখাতে এখন সবচেয়ে আলোচিত শব্দ ‘মেটাভার্স’।

মেটাভার্স একটি ভার্চুয়াল বিশ্ব, যেখানে যন্ত্রের মাধ্যমে নিজেকে যুক্ত করে, অন্তত তাত্ত্বিকভাবে, যেকোনো কাজই করতে পারবেন একজন ব্যক্তি।

দ্য ম্যাট্রিক্স, রেডি প্লেয়ার ওয়ান ও ট্রনের মতো বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্রগুলোতে এমন ভার্চুয়াল বিশ্বের সঙ্গে পরিচিত হয়েছে মানুষ।

জাকারবার্গের মতে, মেটাভার্সের মাধ্যমে যোগাযোগ, উদ্ভাবনসহ সব ধরনের কাজ করতে পারবে মানুষ। আগামী কয়েক দশকের মধ্যে ১০০ কোটি মানুষের কাছে পৌঁছাবে এ প্রযুক্তি।

স্বল্পমেয়াদে এ প্রকল্প থেকে কোনো আয় আসবে না এবং জীবদ্দশায় ব্যক্তিগতভাবে জাকারবার্গের লাভবান হওয়ার সুযোগ নেই বলেও দাবি করেন প্রযুক্তিসম্রাট।

বিশ্লেষকদের তিনি বলেন, ‘বর্তমান তো দূর, নিকট ভবিষ্যতেও এ খাতে বিনিয়োগ আমাদের জন্য লাভজনক নয়। কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি যে মোবাইল ইন্টারনেটের উত্তরসূরী হতে যাচ্ছে মেটাভার্স।’

মেটাভার্সের ‘মেটা’ শব্দটির অর্থ কী

ইংরেজি ভাষায় ‘মেটা’ শব্দটি একটি উপসর্গ, যা অন্য একটি অর্থপূর্ণ শব্দের আগে যুক্ত হয়ে নতুন অর্থ তৈরি করে। যেমন- মেটাকারপাস (কব্জি ও পাঁচ আঙুলের মধ্যবর্তী হাতের তালুর পাঁচটি হাড়), মেটাল্যাঙ্গুয়েজ (আরেকটি ভাষার ব্যাখ্যা করা হয় যে ভাষায়) এবং মেটামোরফোসিস (রূপ পরিবর্তন) ইত্যাদি।

গ্রিক ভাষায় মেটা শব্দের অর্থ ‘গণ্ডির বাইরে’ বা ‘প্রচলিত রীতিকে ভাঙা’।

আবার গণমানুষের সংস্কৃতিতে মেটা শব্দটি ভিন্ন অর্থ বহন করে। আত্মসচেতনতা বা পূর্ববর্তী ধারণাকে ভেঙে এগিয়ে যাওয়া বা নতুন ধারণা গ্রহণের বিষয়টিকে বলা হয় মেটা। সৃজনশীল কাজে শব্দটি বহুল ব্যবহৃত।

কীভাবে কাজ করবে জাকারবার্গের মেটাভার্স

বার্তা সংস্থা এপির প্রতিবেদনে বলা হয়, মেটাভার্স প্রকল্পের অংশ হিসেবে এরই মধ্যে ভার্চুয়াল বাস্তবতা (ভিআর) ও অগমেন্টেড বাস্তবতার (এআর) ওপর বিপুল বিনিয়োগ করেছেন জাকারবার্গ।

কী করতে যাচ্ছে ফেসবুক
অকুলাস কোয়েস্ট ভার্চুয়াল রিয়েলিটি (ভিআর) গেমিং সিস্টেমের মাধ্যমে ত্রিমাত্রিক অভিজ্ঞতা নিচ্ছেন এক ব্যক্তি। ফাইল ছবি
বাস্তব জগতের মতো কিংবা সম্পূর্ণ ভিন্ন কৃত্রিম অভিজ্ঞতা হলো ভার্চুয়াল বাস্তবতা।

অন্যদিকে, অগমেন্টেড বাস্তবতা বলতে বোঝানো হয় বাস্তব শারীরিক বিশ্বের একটি সম্প্রসারিত সংস্করণকে। প্রযুক্তির মাধ্যমে ডিজিটাল ভিজুয়াল উপকরণ, শব্দ ও অন্যান্য সংবেদনশীল উদ্দীপনা ব্যবহারের মাধ্যমে অগমেন্টেড বাস্তবতা অর্জন করা সম্ভব। মোবাইল কম্পিউটিং ও ব্যবসায়িক অ্যাপ্লিকেশনসের সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলোতে অগমেন্টেড বাস্তবতার ধারণা দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে।

ভার্চুয়াল ও অগমেন্টেড বাস্তবতাকে দৈনন্দিন জীবনে পরিচিত করতে অকুলাস ভিআর হেডসেট, এআর চশমা, প্রযুক্তি যুক্ত রিস্টব্যান্ডসহ নানা পণ্য তৈরিতে গবেষণা করছে ফেসবুক।

বলা হচ্ছে, মেটাভার্সের সৃষ্ট ভার্চুয়াল বিশ্বের কোনো সীমা-পরিসীমা থাকবে না। এটা এমন এক ‘ভার্চুয়াল পরিবেশ’ যেখানে কেবল স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে না থেকে আপনি তার ভেতরে ঢুকে চলে যেতে পারবেন যেকোনো স্থানে।

ভিআর হেডসেট, এআর চশমা, প্রযুক্তি যুক্ত রিস্টব্যান্ড, স্মার্টফোন অ্যাপ ও আরও অনেক ডিভাইস ব্যবহারের মাধ্যমে বৈঠক-আড্ডা, খেলাধুলা, কর্মস্থল যেকোনো জায়গায় যোগ দিতে পারবেন আপনি।

এমনকি কেনাকাটা, সোশ্যাল নেটওয়ার্কিংসহ অনলাইনভিত্তিক আমাদের বর্তমান কর্মকাণ্ডও আসবে মেটাভার্সের আওতায়। বাদ থাকবে না কনসার্টে যোগ দেয়া, বেড়াতে যাওয়া, ডিজিটাল পোশাকের ট্রায়ালসহ কোনোকিছুই।

করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে ঘরে বসে অফিসের কাজ করার ক্ষেত্রেও গেম-চেঞ্জার হতে পারে মেটাভার্স। ভিডিও কলের মাধ্যমে মোবাইল বা ল্যাপটপের স্ক্রিনে সহকর্মীদের দিকে তাকিয়ে থাকার দিন শেষ হবে; এর বদলে কর্মীরা একে অপরের সঙ্গে ভার্চুয়ালি বসে কাজ করতে পারবেন, আলোচনা করতে ও কথা বলতে পারবেন- ঠিক যেমন অফিসে করেন।

হরাইজন ওয়ার্করুমসসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের জন্য পরীক্ষামূলকভাবে এ ধরনের সফটওয়্যার চালু করেছে সাবেক ফেসবুক, বা বর্তমান মেটা। অকুলাস ভিআর হেডসেট দিয়ে কাজ করছেন কর্মীরা, যার একেকটির মূল্য শুরুই ৩০০ ডলার থেকে। এখনও পণ্যটির সুবিধার বিষয়ে খুব একটা ইতিবাচক সাড়া মেলেনি।

প্রতিটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকেও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মকে সংযুক্ত করার উপায় খুঁজতে হবে। এজন্য আগে তাদের সম্মিলিতভাবে বিভিন্ন নীতিমালা ও কর্মপরিকল্পনাও গ্রহণ করতে হবে।

ফেসবুক কী পরিপূর্ণভাবে মেটাভার্সেই রূপ নেবে?

জাকারবার্গ জানিয়েছেন, ইন্টারনেটের ভবিষ্যৎ অনেক আশাব্যঞ্জক। এটি ডিজিটাল অর্থনীতির কেন্দ্রে পরিণত হবে।

তাই আগামীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হিসেবে নয়, ফেসবুককে মেটাভার্স প্রতিষ্ঠান হিসেবেই দেখতে শুরু করবে মানুষ।

মেটাভার্স দাঁড় করাতে একজোট হবে অনেক প্রতিষ্ঠান

শুধু তাই নয়, একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে মেটাভার্স কাজ করবে না বলেও জানিয়েছেন জাকারবার্গ। এরই মধ্যে সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান মাইক্রোসফট, চিপনির্মাতা ভিডিয়া আর ভিডিও গেম প্রতিষ্ঠান এপিক গেমস, রোবলক্সের সঙ্গে মেটাভার্সকে এগিয়ে নেয়ার বিষয়ে আলোচনাও শুরু হয়েছে।

জনপ্রিয় ভিডিও গেইম ফর্টনাইটের কারিগর প্রতিষ্ঠান এপিক গেমস এরই মধ্যে বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ১০০ কোটি ডলারের তহবিল সংগ্রহ করেছে। মেটাভার্স প্রতিষ্ঠায় দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রণয়নে ব্যয় হবে এ অর্থ।

শিখন কার্যক্রম, খেলাধুলা, সামাজিকতা রক্ষা ও সাধারণ কাজকর্মের জন্য মেটাভার্সে ত্রিমাত্রিক (থ্রিডি) অভিজ্ঞতা যুক্ত করতে কাজ করছে রোবলক্স।

ইতালিভিত্তিক জনপ্রিয় ফ্যাশন হাউজ গুচি চলতি বছরের জুনে রোবলক্সের সঙ্গে একটি চুক্তি করেছে। চুক্তি অনুযায়ী ডিজিটাল আনুষঙ্গিক পণ্যও বিক্রি করবে তারা।

মেটাভার্সে ঢোকার টিকিট হিসেবে ডিজিটাল টোকেন বিক্রি করেছে কোকা-কোলা ও ক্লিনিক।

সম্পর্কিত খবর