উত্তম বড়ুয়াসহ চার জনের দুর্নীতির প্রমাণ মিলেছে

বিভিন্ন যন্ত্রপাতি কেনাকাটায় ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সরকারের ৬ কোটি ৪০ লাখ ৩১ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে। এই কেনাকাটা হয় রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। সরকারের এই বিপুল অর্থের ক্ষতি করায় হাসপাতালের তৎকালীন পরিচালক অধ্যাপক উত্তম কুমার বড়ুয়াসহ সংশ্লিষ্ট ৪ জনের বিরুদ্ধে তদন্ত করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। তদন্তে দুর্নীতির অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় তৎকালীন পরিচালককে চাকরি থেকে কেন বরখাস্ত করা হবে না, তা লিখিতভাবে জানাতে বলা হয়েছে।

অভিযুক্তরা হলেন- সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সাবেক পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়া, নিউরোসার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. সৌমিত্র সরকার, নেফ্রোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. রতন দাশগুপ্ত এবং সহকারী প্রধান পরিসংখ্যান কর্মকর্তা এসএএম কামরুজ্জামান। অভিযোগ তদন্তে সভাপতিত্ব করেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের

অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) মুহিবুর রহমান। সদস্য সচিব ছিলেন মন্ত্রণালয়ের জনস্বাস্থ্য ২-এর উপসচিব মাসুদুর রহমান এবং সদস্য ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (প্রশাসন) ডা. শেখ মোহাম্মদ হাসান ইমাম।

এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন অনুবিভাগ) সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হলে বিভাগীয় মামলা করা হয়। যেহেতু অভিযুক্তের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় শোকজ নোটিশ দেওয়া হয়েছে, অর্থাৎ বিভাগীয় মামলা চলমান রয়েছে। তিনি ব্যাখ্যা দিয়ে যদি সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষকে সন্তুষ্ট করতে পারেন, তা হলে সাজা থেকে মুক্তি পেতে পারেন। অন্যথায় সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা ২০১৮-এর বিধি ৩ (খ), ৩ (ঘ) এবং ৪ (৩) (ঘ) অনুযায়ী চাকরি থেকে বরখাস্তসহ বিভিন্ন ধরনের সাজা হতে পারে।

তদন্ত কমিটি অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের প্রত্যেকের ব্যক্তিগত দায় নিরূপণ করে প্রতিবেদন দাখিল করে। প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিভাগীয় মামলা ৮১/২০২০-এ অভিযুক্ত ডা. সৌমিত্র সরকার আনীত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করেন। তৎকালীন পরিচালক তৎকালীন উপপরিচালকের অফিসকক্ষে তার প্রস্তুতকৃত আইটেমগুলোর বাজারদরে স্বাক্ষর করতে মৌখিক আদেশ করেন। তিনি এতে অপারগতা প্রকাশ করলে তাকে মৌখিকভাবে তিরষ্কার করা হয়। ডা. সৌমিত্র তদন্ত কমিটির সামনে দাবি করেন ক্ষমতাবান পরিচালক ও উপপরিচালকের নির্দেশের বাইরে যাওয়া তার কোনো উপায় ছিল না। পরিস্থিতির চাপে তিনি স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন।

বিভাগীয় মামলা ৮২/২০২০-এ অভিযুক্ত ডা. রতন দাশগুপ্ত লিখিত বক্তব্যে বলেন, তিনি বাজারদর কমিটির সদস্য হলেও তাকে যন্ত্রপাতির কোনো তালিকা দেওয়া হতো না। কমিটির কোনো মিটিংয়েও ডাকা হতো না। বাজারদর কমিটিতে অন্তর্ভুক্তির পর তৎকালীন পরিচালক মৌখিকভাবে জানান যে, তার এ বিষয়ে কোনো অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণ নেই। এসব বিষয় হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মামুন মোর্শেদ করবেন। এর পর ডা. মামুন তাকে ডেকে নিয়ে বলেন, হাসপাতালের জরুরি কেনাকাটার জন্য হাসপাতাল ও রোগীদের স্বার্থে স্বাক্ষর করা প্রয়োজন। বাজারদর সঠিক নিয়মে হয়েছে। তখনকার পরিচালক ও উপপরিচালকের ইচ্ছায় তাদের প্রস্তুতকৃত বাজারদরে তিনি স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন। বিভাগীয় মামলা ৮৮/২০২০-এ অভিযুক্ত এসএএম কামরুজ্জামান লিখিত বক্তব্যে বলেন, তৎকালীন উপপরিচালক ডা. মামুন মোর্শেদ তাকে অফিসকক্ষে ডেকে নিয়ে জোরপূর্বক স্বাক্ষর করিয়ে নেন। এমনও বলেন, এখানে থাকতে হলে স্বাক্ষর করতে হবে।

তদন্ত কমিটি তাদের মতামতে ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়াকে দোষী সাব্যস্ত করে। বিভাগীয় মামলা চলাকালে কর্তৃপক্ষকে যথাযথভাবে সহায়তা না করে তিনি অসদাচরণ করেছেন বলেও কমিটি মনে করে। বিভাগীয় মামলায় ডা. সৌমিত্রের বিষয়ে বলা হয়েছে, তিনি বাজারদর কমিটির কোনো সভা না করে, বাজারমূল্য যাচাই-বাছাই না করে স্বাক্ষর করেছেন। অভিযুক্ত ডা. রতন এবং কর্মকর্তা কামরুজ্জামানের বিষয়ে তদন্ত কমিটি বলে, বাজারমূল্য যাচাই-বাছাই না করে এবং সভায় না থেকে প্রতিবেদনে স্বাক্ষর করে তারা সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা ১৯৭৯-এর পরিপন্থী কাজ করেছেন।

তদন্ত কমিটি প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করেছে, ক্রয় প্রক্রিয়ায় সংঘটিত দুর্নীতির মূল দায় ক্রয়কারী কর্তৃপক্ষ ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়া। বাজারদর কমিটির সভাপতি ও সদস্যরা বাধ্য হয়ে প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট হয়েছেন। এ ছাড়া হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মামুন মোর্শেদের এই দুর্নীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছে কমিটি।

দ্বিতীয় কারণ দর্শানোর নোটিশ

ডা. উত্তম কুমার বড়–য়াকে চাকরি থেকে কেন বরখাস্ত করা হবে না তা সাত কর্মদিবসের মধ্যে জানাতে নোটিশ দিয়েছেন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সিনিয়র সচিব লোকমান হোসেন মিয়া। গত ২৬ আগস্ট সিনিয়র সচিব স্বাক্ষরিত এই দ্বিতীয় কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। এতে বলা হয়, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ক্রয়কারী কর্র্তৃপক্ষ হিসেবে হাসপাতালের জন্য ৮টি ওটি লাইট প্রকৃত দামের চেয়ে বেশি দামে কেনা হয়েছে। এর ফলে সরকারের চার কোটি ৫৯ লাখ ৬৪ হাজার টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়া দুটি কোবালেশন মেশিন কিনে ৭৮ লাখ টাকা এবং দুটি অ্যানেসথেশিয়া মেশিন কিনে ১ কোটি ১৭ লাখ ২৫ হাজার টাকার আর্থিক ক্ষতি করেছেন। সব মিলিয়ে সরকারের ৬ কোটি ৪০ লাখ ৩১ হাজার ৮০০ টাকার ক্ষতি হয়েছে। এসব অভিযোগে ডা. উত্তমের বিরুদ্ধে ২০২০ সালের ২৯ অক্টোবর বিভাগীয় মামলা হয় এবং কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়।