অস্থিতিশীল দুগ্ধপণ্যের বৈশ্বিক বাজার
টানা দুই বছরের নিরবচ্ছিন্ন প্রবৃদ্ধির পর নিম্নমুখী হতে শুরু করেছে বৈশ্বিক দুধ উৎপাদন। চলতি বছরের শেষ প্রান্তিকে উৎপাদন বড় পরিসরে কমতে পারে। এটি বার্ষিক উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। ২০১৪ সালের পর দুধ উৎপাদনে এমন নিম্নমুখিতা আর দেখা যায়নি। উৎপাদন বিপর্যয়ের কারণে দেখা দিচ্ছে সরবরাহ ঘাটতি। ফলে অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে দুগ্ধপণ্যের বৈশ্বিক বাজার। রোবোব্যাংকের প্রান্তিকভিত্তিক বৈশ্বিক দুগ্ধপণ্য শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
কৃষিবাণিজ্য ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানটি জানায়, মৌসুমের যে সময়ে সবচেয়ে বেশি উৎপাদন হওয়ার কথা ছিল, ঠিক সে সময়েই নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ায় দুধ উৎপাদন কমেছে। কোণঠাসা হয়ে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলোর উৎপাদন প্রবৃদ্ধিও।
রোবোব্যাংকের প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, চলতি বছর বৈশ্বিক দুধ উৎপাদন ঘাটতি প্রকট আকার ধারণ করতে পারে। ফলে দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোয় উৎপাদন প্রত্যাশার চেয়ে বেশি বাড়ার সম্ভাবনা থাকলেও তা বাজারে ভারসাম্য আনতে ব্যর্থ হবে।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, টানা নয় প্রান্তিকজুড়ে বৈশ্বিক দুধ সরবরাহ বাড়লেও চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে এসে প্রধান দুধ রফতানি অঞ্চলগুলোর সরবরাহ কমে যায়। শেষ প্রান্তিকে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
রোবোব্যাংকের ঊর্ধ্বতন দুগ্ধপণ্যের বাজার বিশ্লেষক মাইকেল হার্ভি বলেন, চলতি বছরের চতুর্থ প্রান্তিকে শীর্ষ সাত দুধ রফতানিকারক—নিউজিল্যান্ড, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ায় সম্মিলিত দুধ উৎপাদন গত বছরের একই সময়ের তুলনায় দশমিক ৩ শতাংশ কমতে পারে। দুই বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো দেশগুলোর চতুর্থ প্রান্তিকের উৎপাদন কমতে যাচ্ছে।
প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, বিশ্বজুড়ে পণ্যের ক্রমবর্ধমান দামের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বেড়েছে ফার্মগেট দুধের মূল্য। বেশ কয়েকটি অঞ্চলে দাম আরো বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। দাম বাড়ার পেছনে উৎপাদন ঘাটতির পাশাপাশি পশুপালন ব্যয় বৃদ্ধিকে দায়ী করা হচ্ছে। রয়েছে ব্যাপক শ্রমিক সংকট, প্রতিকূল আবহাওয়া ও পশুখাদ্যের প্রশ্নবিদ্ধ মানের প্রভাবও।
রশদ সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় শ্লথগতি দেখা দিয়েছে বৈশ্বিক দুগ্ধপণ্য রফতানিতেও। পরিবহন ব্যয় ও পণ্যের বাজারদরের ঊর্ধ্বগতি রফতানির জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চলতি বছরের প্রথমার্ধে দুগ্ধপণ্যের রফতানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭ শতাংশ বাড়লেও দ্বিতীয়ার্ধে কমতে শুরু করে।
গ্লোবাল ডেইরি ট্রেডের (জিডিটি) সর্বশেষ নিলামে সাত বছরের সর্বোচ্চে উঠেছে দুগ্ধপণ্যের মূল্যসূচক। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারে দুগ্ধপণ্যের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। কিন্তু সে অনুপাতে নেই পর্যাপ্ত সরবরাহ। এ কারণে লাফিয়ে বাড়ছে দাম। অন্যদিকে ২০২১-২২ মৌসুমে ফন্টেরা কো-অপারেটিভ গ্রুপ খামারিদের ফার্মগেট দুধের সর্বোচ্চ মূল্য পরিশোধের উদ্যোগ নিয়েছে। বিষয়টিও দুগ্ধপণ্যের দাম আকাশচুম্বী হয়ে উঠতে সহায়তা করেছে।
তথ্য বলছে, চলতি বছরের আগস্টের পর দুগ্ধপণ্যের মূল্যসূচকে ঊর্ধ্বমুখিতা অব্যাহত আছে। এ ধারাবাহিকতায় গত মঙ্গলবার নিউজিল্যান্ডে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ জিডিটি নিলামে দুগ্ধপণ্যের মূল্যসূচক আগের নিলামের তুলনায় ১ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে, যা ২০১৪ সালের মার্চের পর সর্বোচ্চ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এ বছর বিশ্বজুড়ে গোখাদ্যের দাম বেড়েছে লক্ষণীয় মাত্রায়। আবহাওয়াও ছিল দুধ উৎপাদনের জন্য প্রতিকূল। এসব কারণে চলতি মৌসুমে নিউজিল্যান্ডসহ বিশ্বের প্রধান প্রধান দেশে দুগ্ধপণ্য উৎপাদন কমে গেছে। এটি দুগ্ধপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে প্রভাবকের ভূমিকা পালন করছে।


