অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও এসডিজি অর্জনে অপরিহার্য জ্বালানি খাত
যেকোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পেছনের প্রধান সূচক হলো পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ। স্বাধীনতার পর দেশের জনসংখ্যার মাত্র ৩ শতাংশের বিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগ ছিল। বর্তমানে বাংলাদেশেরসহ ২৩ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা রয়েছে এবং ১০০ শতাংশ জনগোষ্ঠী বিদ্যুতের আওতায় এসেছে। বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের (বিপিডিবি) সূত্রানুসারে, বিদ্যুৎ উৎপাদনে উদ্বৃত্ত প্রায় আট হাজার মেগাওয়াট।
ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স, বাংলাদেশের (আইসিসিবি) ত্রৈমাসিক বুলেটিনের সম্পাদকীয়তে এমনটা উল্লেখ করা হয়।
সম্পাদকীয়তে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশের জিডিপি গত এক দশকে অর্থাৎ ২০১০ থেকে ২০১৯ সালে ৬ দশমিক ৫ থেকে ৮ দশমিক ২-এ উন্নীত হয়েছে। ২০১০ সালে সরকারি খাতে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ছিল ৩ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট। ২০১০ সালের এপ্রিলে ঢাকায় অনুষ্ঠিত আইসিসি বাংলাদেশের এনার্জি ফর গ্রোথ সম্মেলনে ১৫টি দেশের বিশেষজ্ঞরা অংশ নিয়েছিলেন, তারা ফিদেল রামোসের ফিলিপিন্সের প্রেসিডেন্ট থাকাকালের সাফল্যের কথা উল্লেখ করে টেন্ডার ছাড়াই বেসরকারি খাতের জন্য বিদ্যুৎ খাত উন্মুক্ত করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। সরকার পরামর্শটি অনুসরণ করেছে এবং এর ফলে দেশে এখন উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা রয়েছে।
বর্তমানে দেশের বাণিজ্যিক জ্বালানি সম্পদ হলো: দেশীয় প্রাকৃতিক গ্যাস, কয়লা, আমদানি করা তেল, এলপিজি, আমদানি করা এলএনজি, আমদানি করা বিদ্যুৎ ও জলবিদ্যুৎ। এর মধ্যে প্রাথমিক এনার্জির প্রায় ২৭ শতাংশ পূরণ করে বায়োগ্যাস এবং বাকি ৭৩ শতাংশ পূরণ হয় বাণিজ্যিক এনার্জি দ্বারা। প্রাকৃতিক গ্যাস বাণিজ্যিক বিদ্যুতের প্রায় ৬২ শতাংশ (৮ শতাংশ আমদানি করা এলএনজিসহ) এবং আমদানি করা তেল দ্বারা বাকি অংশের সিংহভাগের প্রয়োজন মেটানো হয়। এ সময় সাম্প্রতিক বিশ্ব প্রবণতা অনুসারে এলএনজি ও কয়লার সরবরাহ কেবল অনিশ্চিত নয়, কয়লা ও গ্যাসভিত্তিক প্লান্ট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে বলে মন্তব্য করা হয় সম্পাদকীয়তে।
সম্পাদকীয়তে উল্লেখ করা হয়, দেশের ট্রান্সমিশন ক্ষমতা গত এক বছরে ১২ হাজার ৮৮৮ সার্কিট লাইন কিমি থেকে মাত্র ১০৪ সার্কিট লাইন কিলোমিটার বেড়ে ১২ হাজার ৯৯৬ কিমি হয়েছে। আগামী দু-তিন বছরের মধ্যে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট, মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট এবং রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে। এছাড়াও, অধিক সিস্টেম লস, নতুন প্লান্ট সম্পূর্ণ করতে বিলম্ব, কম দক্ষতাসম্পন্ন প্লান্ট, অনিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহ, বিদ্যুৎ চুরি এবং পাওয়ার প্লান্ট রক্ষণাবেক্ষণের জন্য তহবিলের ঘাটতি সমাধানে মনোযোগ দেওয়া উচিত।
বর্তমানে বাংলাদেশের জিডিপি ৪৫৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা ১৯৭১ সালে ছিল মাত্র ৬ দশমিক ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আশা করা হচ্ছে যে ২২-২৩ অর্থবছরে জিডিপি ৫১০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ৭ শতাংশের বেশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের আনুমানিক ৩৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন হবে। তাই বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন যে অন-শোর এবং অফ-শোর গ্যাস ও তেল অনুসন্ধান, বিদ্যুৎ সঞ্চালন এবং বিতরণ বিভাগগুলোর উন্নয়নের জন্য সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া উচিত।
সম্পাদকীয়তে বলা হয়, গত এক দশকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম দ্রুততম বর্ধনশীল অর্থনীতির তালিকায় স্থান পেয়েছে। এ সাফল্যের পেছনে রয়েছে বিশাল জনগোষ্ঠী, শক্তিশালী তৈরি পোশাক খাতের রফতানি আয় এবং স্থিতিশীল সামষ্টিক অর্থনীতি। অব্যাহত রফতানি আয় এবং ব্যয় পুনরুদ্ধার চলতি অর্থবছরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ৬ দশমিক ৪ শতাংশে উঠতে সাহায্য করবে। বাংলাদেশের ওপর সাম্প্রতিক বিশ্বব্যাংকের পর্যালোচনায় উপরোক্ত বিষয়গুলো উঠে এসেছে।


