অবহেলিত খনিজ প্রাচুর্যের স্থান জামালগঞ্জ

জয়পুরহাটের জামালগঞ্জে ভূগর্ভস্থ কয়লার মজুদ আবিষ্কার হয় ১৯৬২ সালে। কয়লাক্ষেত্রটি অবস্থিত ১১ দশমিক ৬৬ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে। জাতিসংঘ ও তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের খনিজ সম্পদ বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধি দলের প্রাথমিক জরিপে খনিটিতে কয়লা মজুদের সম্ভাব্য পরিমাণ ধরা হয় ১০০ কোটি টন। এরপর দীর্ঘদিন খনিটি নিয়ে তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।

২০১৫ সালে খনিতে মজুদকৃত কয়লায় গ্যাসের অস্তিত্ব রয়েছে কিনা, সে বিষয়ে একটি অনুসন্ধান চালানো হয়। সে সময় পেট্রোবাংলার নিয়োগকৃত ভারতীয় পরামর্শক প্রতিষ্ঠান মাইনিং অ্যাসোসিয়েট প্রাইভেট লিমিটেডের (এমএপিএল) জরিপে উঠে আসে, খনিটিতে কয়লার মজুদ রয়েছে ৫৫০ কোটি টন।

ভারতীয় প্রতিষ্ঠানটির দেয়া তথ্যে উঠে আসে, জামালগঞ্জের খনিতে যে পরিমাণ গ্যাস রয়েছে, তা উত্তোলনযোগ্য নয়। প্রতিষ্ঠানটি খনিটি থেকে কয়লা ও গ্যাসের উত্তোলনযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করলেও বর্তমানে চীনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আরো গভীর খনি থেকে কয়লা উত্তোলন করে ব্যবহার করা হচ্ছে। অন্যদিকে এ প্রকল্পে নিয়োজিত পেট্রোবাংলার তৎকালীন কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরাও জানিয়েছিলেন, খনিটি থেকে সুড়ঙ্গ পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করা সম্ভব। ২০১৬ সালে এ সমীক্ষা প্রকাশিত হওয়ার পর সেখানে কয়লার বাণিজ্যিক উত্তোলনযোগ্যতা নিয়ে আর কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি।

বর্তমানে বিশেষজ্ঞ মহলে আবারো আলোচনায় আসছে কয়লা খনিটি। জ্বালানি পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারের বর্তমান অস্থিতিশীলতা দেশের অর্থনীতিতে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে ভূগর্ভস্থ খনিজ জ্বালানি সম্পদ নিয়ে উদ্যোগহীনতার বড় নিদর্শন হয়ে দাঁড়িয়েছে জামালগঞ্জ কয়লা খনি। জামালগঞ্জের মতো খনিগুলোর সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো গেলে বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের অর্থনীতিতে চাপ অনেক কম অনুভূত হতো বলে অভিমত বিশেষজ্ঞদের।

তারা বলছেন, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে খনিটি থেকে কয়লা উত্তোলন করা গেলে তাতে স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি রফতানির সম্ভাবনা তৈরি হতো। তবে এক্ষেত্রে কয়লা খনিটিতে অনেক উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে, যার জন্য বিশেষভাবে বড় বিনিয়োগের প্রয়োজন। কয়লা খনিটিতে প্রয়োজনীয় এ বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে জ্বালানি সমস্যার টেকসই একটি সমাধান হাতে পাওয়ার বড় সম্ভাবনা ছিল।

খনির গভীরতা অনেক বেশি থাকায় জামালগঞ্জ থেকে কয়লা উত্তোলনের উদ্যোগ নেয়া হলে সেখানে বড়পুকুরিয়ার মতো ভূমিধসের কোনো সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। অন্যান্য কয়লা খনির গভীরতা যেখানে ১৫০-৫০০ মিটার, সেখানে জামালগঞ্জের কয়লা খনির গভীরতা ৬০০ থেকে ১ হাজার ২০০ মিটার। ওপরের মাটির কঠিন অবস্থা ও শক্ত প্রকৃতির হওয়ায় দুর্ঘটনার সম্ভাবনাও কম।

সরেজমিন পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, পাকিস্তান আমলে অধিগ্রহণকৃত জমিতে খনি রক্ষণাবেক্ষণকাজে ব্যবহূত কোনো স্থাপনা নেই। ২০১৯ সালে পেট্রোবাংলা অধিগ্রহণকৃত জমির সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করে। একজন নিরাপত্তা কর্মী দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে খনি এলাকাটি দেখভাল করছেন। বর্তমানে খনির জমিতে চাষাবাদ হচ্ছে।

অধিগ্রহণকৃত জমিটির দেখভালে নিয়োজিত মোফাজ্জল হোসেনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একসময় সেখানে কয়লা অনুসন্ধানে কূপ খনন করা হয়েছিল, এখন সেটি মাটি ভরাট হয়ে গেছে। বর্তমানে অধিগ্রহণকৃত জমি সরাসরি পেট্রোবাংলা দেখভাল করছে।

বর্তমানে বিশ্ববাজারে কয়লাসহ জ্বালানি পণ্যের মূল্যে যে অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে, তার ভিত্তিতে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে স্থানীয় পর‍্যায়ে উত্তোলনের পক্ষে মত দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের ভাষ্যমতে, দেশে এখন কয়লাভিত্তিক অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মিত হচ্ছে। আমদানিনির্ভর কয়লা দিয়ে এসব কেন্দ্র চালানো হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ পড়বে অনেক বেশি। অন্যদিকে জ্বালানি খাতকেও বাঁচিয়ে রাখতে হবে ভর্তুকি দিয়ে।

বিশ্ববাজারের বর্তমান মূল্য পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারাও স্বীকার করছেন স্থানীয় উত্তোলনে উদ্যোগের বিকল্প নেই। এরই মধ্যে বড়পুকুরিয়া থেকে পুনরায় কয়লা উত্তোলনে কার্যক্রম শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের বাকি খনিগুলো থেকে কয়লা উত্তোলনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাটি।

গভীরে থাকা খনি থেকে কয়লা ও গ্যাস উত্তোলনে প্রধানত দুই ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এর একটি হলো ইউসিজি, অন্যটি সিবিএম। গভীর খনি থেকে কয়লা উত্তোলনে ইউসিজি পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। চীন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ইন্দোনেশিয়া, ভারত ও উজবেকিস্তানের মতো দেশগুলো মূলত এ পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করছে।

ইউসিজি পদ্ধতিতে ভূগর্ভের কয়লার স্তরকে অক্সিজেন ও বাষ্প দিয়ে নিয়ন্ত্রিতভাবে পুড়িয়ে ভেতরে উত্পন্ন গ্যাস পাইপলাইন দিয়ে তুলে বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহ করা হয়। অন্যদিকে খনির কয়লা না পুড়িয়ে ভেতর থেকে মিথেন গ্যাস বের করে নিয়ে আসাকে সিবিএম পদ্ধতি বলা হয়।

জামালগঞ্জের কয়লা খনি থেকে সম্ভাব্য উত্তোলন পদ্ধতি নিয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক বদরূল ইমাম বলেন, জামালগঞ্জ কয়লা খনির উন্নয়ন করতে হলে শুরুতেই সিবিএম ও পরে ইউসিজি পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে পরীক্ষামূলকভাবে ইউসিজি পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে।

তথ্য অনুযায়ী, দেশের অন্য কয়লা খনিগুলোর মধ্যে রংপুরের খালাসপীরে অবস্থিত কয়লা খনিতে মজুদের পরিমাণ সাড়ে ৬৮ কোটি টন। এছাড়া দিনাজপুরের দীঘিপাড়া খনিতে ৫০ কোটি টন ও ফুলবাড়ীতে ৫৭ কোটি ২০ লাখ টন কয়লা মজুদ রয়েছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক ম তামিম বলেন, জামালগঞ্জে খনিতে যে কয়লা রয়েছে, সেটি অনেক গভীরে। এক্ষেত্রে কয়লা মাটির নিচে জ্বালিয়ে দিয়ে উত্তপ্ত অবস্থায় ওপরে এনে টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যেতে পারে। এটি একটি অনেক অগ্রসর প্রযুক্তি, যা আমাদের দেশীয় কোম্পানির কাছে নেই। যদিও এ প্রযুক্তিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঝুঁকি রয়েছে।